মুখে হাসিটা ধরে রাখতেই হয়

prothomalo-bangla_2021-05_6401a716-84ed-4a1f-b87d-7e48f371a143_129e729d_57e4_4ae0_abcf_d7038d6a3090.jpg

বাসায় বাচ্চার অসুস্থতা বা অন্য কোনো বিপদ হলেও ফ্লাইটে থাকার সময় মুখে হাসিটা ধরে রাখতেই হয়। এই হাসিমুখ চাকরির একটি অংশ। আর বিভিন্ন রঙের শাড়ির ইউনিফর্ম পরার পরেই সব কষ্ট উধাও হয়ে যায়। বিদেশে গেলে অনেকেই উৎসুক হয়ে তাকান, কোন দেশ, তা জানতে চান। তখন খুব গর্ব হয়। ফ্লাইটে থাকার সময় যাত্রীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে একসময় নিজের কষ্টের কথাও মনে থাকে না।
কথাগুলো বলছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস মারিয়াম ফাতেমা সেহেলী। তিনি ১৫ বছর ধরে এ চাকরি করছেন। একই সঙ্গে সামলাচ্ছেন ঘরসংসার।

৩১ মে সোমবার আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। আকাশপথে যাত্রীদের সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত কেবিন ক্রুদের সম্মানে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়। দিবসটি ধরেই কথা হয় মারিয়াম ফাতেমার সঙ্গে। করোনার প্রাদুর্ভাবে কাজের চাপ কিছুটা কম। দীর্ঘ ১৫ বছরের মধ্যে এত বেশি সময় কখনোই বাসায় থাকা হয়নি। ১০ বছর বয়সী সামিন ইয়াসার বলতে গেলে মাকে ছাড়াই বড় হচ্ছিল। করোনায় মাকে একটু বেশি সময় কাছে পেয়েছে।

মারিয়াম বললেন, ‘আগে ছেলে কখনোই চাকরি নিয়ে কিছু বলত না। বলতে গেলে মাকে ছাড়াই সে বড় হয়ে গেছে। তবে এখন একটু বেশি সময় কাছে পাচ্ছে বলে আবদার বেড়েছে। বন্ধুদের যে মায়েরা বাইরে চাকরি করেন না, সেই মায়েদের মতো হতে বলে।’

ফ্লাইটে থাকার সময় যাত্রীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে একসময় নিজের কষ্টের কথাও মনে থাকে না।

মারিয়াম ফাতেমা সেহেলী

মারিয়াম বললেন, একটি ফ্লাইটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ফ্লাইটে অনবোর্ড করা, নির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সম্পর্কে বলা, খাবার দেওয়া, ককপিটের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা, কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে গেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াসহ পুরো ভ্রমণেই যাত্রী যাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তা খেয়াল রাখতে হয়।
ছোটবেলা থেকেই মারিয়াম বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে পছন্দ করতেন। আর এ চাকরি তাঁকে সুযোগটি হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যে যে দেশে যায়, তার প্রায় সব কটি দেশেই যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন মারিয়াম। প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট যখন বিশেষ সফরে যান, সেই ভিভিআইপি ফ্লাইটে স্পেন, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, আজারবাইজান, ব্রুনেই, মরক্কো, বেলারুশ, ইতালি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন।

সিনেমা বা নাটকে প্রায়ই দেখায় যাত্রীদের কেউ কেউ নারী কেবিন ক্রুদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে মারিয়াম বললেন, হয়তো একসময় এ ধরনের পরিবেশ ছিল। তবে দীর্ঘ ১৫ বছরের চাকরিজীবনে এ ধরনের কোনো ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি। হয়তো যাত্রা শুরু করতে না করতেই কেউ টয়লেটে যেতে চাচ্ছেন বা খাবার খেতে চাচ্ছেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাতে আপত্তি জানালে অনেক সময় যাত্রীদের কেউ কেউ বিরক্ত হন, এর বাইরে অশোভন আচরণ করছেন, তেমন অভিজ্ঞতা নেই। তবে নেতিবাচক প্রচারটা এখনো চলছেই।

কেন এই চাকরি বেছে নিলেন, এ প্রসঙ্গে মারিয়াম বললেন, চাকরির বিজ্ঞাপন যখন হাতে পেয়েছিলেন, তখন তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তখন কেবিন ক্রু পদে চাকরির যোগ্যতা চেয়েছিল এইচএসসি পাস এবং বয়স ১৮ থেকে ২২ বছর। আবেদন করেই দেখি, অনেকটা এমন ভাব নিয়েই আবেদন করেন তিনি।

বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নারী কর্মীরা ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছেন।

মারিয়াম বললেন, ‘বাবা কাস্টমসে চাকরি করতেন। বাবা বললেন, “চাকরি না পাও, ইন্টারভিউ দিলে অভিজ্ঞতা তো হবে।” একবারেই চাকরিটা পেয়ে যাই। বাবার বাড়িতে আমার এ চাকরি নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। বিয়ের পর স্বামী যেহেতু এ চাকরি পছন্দ করেন, তাই কোনো আত্মীয় আর এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। বাবা ও শ্বশুরবাড়িতে কেবিন ক্রু হিসেবে একমাত্র আমিই চাকরি করছি। বলতে গেলে সবাই আমাকে নিয়ে গর্ব করেন।’

মারিয়াম ফাতেমা সেহেলীর স্বামী এম এ জাহের ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট (অলটারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলস) হিসেবে কর্মরত। তিনি সংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। মারিয়াম বললেন, ‘নারীদের যেকোনো কাজের জন্যই পরিবারের সহায়তা বা সাপোর্ট পেতে হয়। আমার যে চাকরি, তাতে পারিবারিক সাপোর্ট ছাড়া চাকরি করাই সম্ভব না। বেশির ভাগ সময় পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি না। ছেলের জন্মদিন, ঈদ, এমনকি নিজেদের বিবাহবার্ষিকীতেও দেখা যায় আমি অন্য কোনো দেশে আছি। তখন সব সামলায় আমার স্বামী। অনেক ক্ষেত্রে এমন সময় ফ্লাইট থাকে, যখন বাসার অন্যরা ঘুমে বা কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে দেখি সবাই ঘুমে।’

কেউ চাইলেও ইচ্ছামতো খাওয়াদাওয়া বা হিসাব না কষে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন না। তাঁকে নিয়ম মেনে চলতেই হয়, যাতে দীর্ঘদিন সুস্থও থাকা যায়।

বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নারী কর্মীরা ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছেন। বাচ্চা, স্বামী এবং বাবা-মায়ের অসুস্থতা বা কোনো সমস্যায় অফিস সর্বোচ্চ সহায়তা দেয়। নিজের অভিজ্ঞতায় মারিয়াম বললেন, ‘আমি চাকরি পাওয়ার পর মাস্টার্স করেছি। পরীক্ষার সময় ছুটি দিয়ে অফিস সহায়তা করেছে। বাচ্চা হওয়ার সময় ছয় মাস সবেতনে ছুটি পেয়েছি। এরপর পাওনা ছুটি এবং বেতন ছাড়া প্রায় দেড় বছর ছুটি কাটিয়েছি। বাচ্চার বয়স যখন কম ছিল, তখন স্পেশাল রোস্টারের মাধ্যমে দেশের ভেতরে বিভিন্ন ফ্লাইট শেষে বাসায় থাকার সুযোগ পেয়েছি। টিকিটের বিশেষ ছাড়ে আমরা পরিবার নিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যেতে পারি। দেশের বাইরে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাদের পাঁচ তারকা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ।’

পরিবারের সঙ্গে মারিয়াম ফাতেমা সেহেলী

পরিবারের সঙ্গে মারিয়াম ফাতেমা সেহেলী
ছবি: সংগৃহীত

মারিয়াম হাসতে হাসতে বললেন, বিদেশে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখার সুযোগ, ইচ্ছামতো শপিং করা, বিভিন্ন দেশের খাবারের স্বাদ নেওয়া এবং বহু মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ—অন্য কোনো চাকরিতেই পাওয়া সম্ভব ছিল না। তবে বিভিন্ন দেশের ‘টাইম জোন’ অনুযায়ী ফ্লাইট করা, রাত জাগা, দীর্ঘ সময় ফ্লাইটে থাকা, এগুলোও মেনে নিতে হয়।
মারিয়ামের মতে, দেশে এখনো কেবিন ক্রু হিসেবে, বিশেষ করে নারীদের এ চাকরি করার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারেন না বা যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তবে আস্তে আস্তে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে বলেও উল্লেখ করলেন তিনি।

মারিয়াম বললেন, এই চাকরিতে যাত্রী সন্তুষ্টির পাশাপাশি নিজেকে পরিপাটি করে উপস্থাপন করা, উচ্চতার সঙ্গে ওজন ঠিক রাখা, অর্থাৎ নিজের ফিটনেসের দিকেও নজর দিতে হয়। এতে কেউ চাইলেও ইচ্ছামতো খাওয়াদাওয়া বা হিসাব না কষে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন না। তাঁকে নিয়ম মেনে চলতেই হয়, যাতে দীর্ঘদিন সুস্থও থাকা যায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন