ভেন্টিলেটর

134835_bangladesh_pratidin_venti.png

সজল আশফাক

এক

– এই শাওন, বাবা কখন এসেছে?
– কালই তো এলো, তুমিই তো এয়ারপোর্টে গেলে আনতে। এটা কেমন কথা! বেশ বিরক্তি নিয়েই স্বামী সাদেকের প্রশ্নের উত্তর করলো শাওন।

দুই
সাদেক ইদানিং এরকম আজগুবি প্রশ্ন করে শাওনকে। মনে হয় যেন কোনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে কিংবা স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে যেমন হঠাৎ করে অতিপরিচিত কেউ একজন এমন জায়গায় এসে ঢুকে পড়ে যেখানে তার হয়তো থাকারই কথা নয়।
এই তো ক’দিন আগেই সাদেক বলছিলো- স্বপ্নে সে তার মাকে দেখেছে নিউ ইয়র্কে ফেরি করে মাস্ক বিক্রি করছে। কী অদ্ভুত না! অথচ সাদেকের মা মারা গেছেন দুইবছর তো হবেই। তাও বাংলাদেশে। সাদেক এখন নিউ ইয়র্কে থাকে তাই স্বপ্নে মাকে নিয়ে এসেছে নিউ ইয়র্কে, তাও ফেরিওয়ালা হিসাবে! করোনাকাল বলে মাস্ক বিক্রি করছে। এটা কোন কথা!

 

দৃশ্যটা ভেবেই রাগে গজগজ করে ওঠে শাওন।

স্বপ্নের কথা এটুকু বলেই থামে না সাদেক। বলে তার মা নাকি লাঠির মধ্যে নানারকমের মাস্ক ঝুলিয়ে তাদেরই নেইবারহুডে ঘুরছে। স্বপ্নের বাকি বর্ণনায় শাওন চরম বিরক্ত হয়, নিজের অমন শান্ত, সৌম্য, প্রয়াত শাশুড়িকে নিয়ে স্বপ্নের দোহাই দিয়ে হলেও এমন দৃশ্যকে হজম করতে পারে না সে। তাই প্রায় চেঁচিয়েই বলে ওঠে- থামো তো, নিজের মাকে এমন বর্ণনা দিতে একটুও খারাপ লাগছে না?

সাদেক শান্ত গলায় উত্তর দেয়- খারাপ লাগবে কেন? স্বপ্নে যা দেখেছি তাই বলেছি। যখন স্বপ্ন দেখছিলাম তখন খারাপ লাগছিলো, রাগও হচ্ছিলো। মা কেন ইনকাম করার জন্য বুড়ো বয়সে এই কাজ করবে? কেন করোনার সময়ে বাইরে ঘুরবে? কিন্তু ঘুম ভাঙ্গার পর যখন বুঝলাম ওটা স্বপ্ন,  তখন আর খারাপ লাগছে না। তবে কী জানো, এই স্বপ্ন কিন্তু করোনা আতঙ্কের ফল।

– ওকে, ওকে, যা বলেছো, আর বলতে হবে না, প্লিজ স্টপ ইয়োর করোনা রিসার্চ
বলে সেদিন সাদেককে নিবৃত্ত করলো শাওন।

তিন
কিন্তু বাবা কখন, কীভাবে এসেছেন? এই বিষয়টা সাদেকের মাথা থেকে কোনোভাবেই মুছে যাচ্ছে না। এতো আর বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা নয়। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় বরিশাল থেকে প্রায়ই বাবা ঢাকা আসতেন। বরিশাল থেকে লঞ্চগুলো খুব ভোরে এসে ঢাকায় পৌঁছায় বলে বাবা খুব ভোরে এসে কলিংবেল চাপলে ওরা টের পাওয়ার আগেই বেশিরভাগ সময়ে কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিতো। সবাইকে  ঘুমাতে দেখে বাবা কাজের মেয়েকে বলতেন- কাউকে ডাকিস না ওরা অনেক রাত জাগে, ওরা ঘুমাক। বাবা সেই ভোরেই গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করার পর আবার বেরিয়ে পরতেন, যে কাজের জন্য আসতেন তিনি সেই কাজে। আর সাদেকের যদি তাড়া থাকতো, তাহলে  তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে কাজের মেয়ে কোন কোন দিন সাদেককে আর জানানোরই সুযোগ পেতো না যে বাবা এসেছেন।
শাওন তখনো ভার্সিটিতে পড়ে, ক্লাসগুলো অধিকাংশই ছিল বেলা ১১টার দিকে। শাওন সকালে বাসায় থাকতো বলে বেশিরভাগ সময়েই পরে শাওন ফোন করে দিত খবরটা- এই শোন, ভোরে বাবা এসেছেন, বেরিয়েছেন, বলে গেছেন। একেবারে বিকালে ফিরবেন!
কিন্তু এটা তো ঢাকার নিউ ইস্কাটন নয়, নিউ ইয়র্ক।
বাবা নিউ ইয়র্কে এসেছেন, তাও প্রথমবার।  কিন্তু শাওন যে বললো, সাদেক নিজেই এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছে। আসলেই কি শাওন এমনটা বলেছে, নাকি নিজে নিজে অনুমান করে উত্তর খুঁজে নিয়েছে, মনগড়া উত্তর। হয়তো ভেবেছে শাওনকে জিজ্ঞাসা করবে কিন্তু এখনো জিজ্ঞাসাই করেনি, সামনে পেলেই করবে।
কিন্তু বাবাকে জেএফকে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় নিয়ে এসেছে, এই বিষয়টা সে মনে করতে পারছে না? এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সাদেক। সাদেক মনে মনে খুব ভয় পেলো, তাহলে তার কি আলঝেইমার্স  হয়েছে? এতো ডিমেনসিয়ায় তো স্বাভাবিক মানুষের হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া বয়স এখনো চল্লিশের কোঠায়।  সাথে সাথে শিউলি আপার কথা মনে পড়ে সাদেকের। শিউলি আপা সাদেকের চাচাতো বোন, বয়সে তার চেয়ে অনেক বড়। আলঝেইমার্স হওয়ার পর অনেক কিছুই ভুলে যেতেন, চিনতে পারতেন না, আবার অতীতের স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে সেই সময়টাকেই বর্তমান ভেবে কথা বলতেন। এইসব ভেবে ভেবে মুষড়ে পড়ছে সাদেক।
এদিকে বাবার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নিউ ইয়র্কে তিনি অনেকদিন থেকেই আছেন।  নিউ ইয়র্ক সিটির  হালচাল তার কিছুটা হলেও জানা আছে। একটু আগেই তিনি হাঁটার জন্য বেরিয়ে ছিলেন। মাস্ক পরেই বেরিয়েছিলেন।

চার
নিউ ইয়র্কে লকডাউন এখনো পুরোপুরি উঠে যায়নি। তার আগেই এসেছে করোনার দ্বিতীয় দফার ঢেউ মানে সেকেন্ড ওয়েভ। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে স্কুলগুলো আবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শাওন এখানে একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়ায়, ওর কাজ প্যান্ডেমিকের শুরু থেকেই অনলাইনে। একমাত্র সন্তান ইরফানও অনলাইনেই ক্লাস করছে। সবাই ঘরেই থাকছে কিন্তু টেনশন সাদেককে নিয়ে। সাদেক একটা ব্যাংকে কাজ করে, প্রতিদিনই যেতে হয়। সাদেক ঠিক বেপরোয়া নয় কিন্তু বাইরে যাওয়ার সময় প্রায়ই মাস্ক পরতে ভুলে যায়। ভুলে যায় হ্যান্ডস্যানিটাইজ করতে। বিষয়টি নিয়ে শাওনের সাথে দু’একবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। শাওন বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস। করোনার এই প্যান্ডেমিকে প্রোটেকশনের এই বিষয়গুলো সাদেক জানে, বোঝে এর গুরুত্বটাও। কিন্তু নিয়মগুলো মেনে চলতে ভুলে যায়। তাছাড়া সাদেকের মনে করোনা নিয়ে তেমন কোন ভয়ও কাজ করে না। তবে শাওন এ ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। করোনা নিয়ে ওর মধ্যে ভয়টা একটু বেশিই বলা যায়। মনের মধ্যে অজানা এক আশংকায় ওর বুকটা চেপে আসে। শাওনের কেন জানি মনে হয়, কিছু একটা ঘটবে, যাই ঘটুক।

পাঁচ
সাদেক লক্ষ করলো বাবা এসেছেন, অথচ সাদেকের সাথে বাবার কোনো কথাই হয়নি। এটা কী করে সম্ভব? হ্যাঁ, কেউ অনেকদিন ধরে একসাথে থাকলে তার সাথে ক্ষণে ক্ষণে কথা বলার বিষয় হয়তো থাকে না। যেমনটা হয় শাওনের সাথে। শাওন যখন ব্যস্ত থাকে তখন ওর সাথে আলগা প্রেম দেখাতে যেয়ে কথা বলতে যাওয়া মানে কাজের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য বিনিময়ে ধমক খাওয়া।
কিন্তু বাবার তো এখানে কাজ নেই। তার ওপর কতদিন পরে দেখা। তার সাথে কথা বলার সুযোগই হলো না! একেক বার মনে কিছু একটা কথা বোধ হয় হয়েছে কোন এক সময়ে, একটু পরে নিশ্চিত করেই মনে  হয়, না কোন কথা হয়নি। আশপাশ দিয়ে যাচ্ছেন, ঘুরঘুর করছেন তবে কোন কথা উনি বলেননি। আর কথা হবেই বা কীভাবে? কেমন একটা ভদ্রোচিত শান্ত মেজাজের লুকোচুরি চলছে সযত্নে দু’জনের মধ্যে।
বাবা ডাইনিং স্পেসে তো সাদেক তখন লিভিংরুমে, সাদেক লিভিংরুমে তো বাবা বাথরুমে। সাদেক দেখলো বাবার প্রিয়খাবার দিয়ে ডাইনিংটেবিলটা সাজানো। বাসমতি চাল, পাবদা মাছ কম ঝোল আর ধনেপাতা দিয়ে রান্না করা, ভূনা গরুর মাংস, গোল গোল করে কাটা সবুজ ঢেঁড়স ভাজি, সাদা একটা সিরামিকের পিরিচে সবুজ বাকলযুক্ত লেবুর কয়েক ফালি, সাদা প্লেটের কিনারায় টকটকে লালরঙের ছোট ছোট ফুল, ভেঙ্গে যাওয়া কাপের নিঃসঙ্গ পিরিচ দিয়ে বানানো বোনপ্লেট, পানি ভর্তি স্বচ্ছ কাঁচের জগ, গ্লাসটা ইতোমধ্যে পানিতে পূর্ণ। মনে হচ্ছে যেন ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় পুরানো কোনো একদিনে বাবার জন্য সাজানো ডাইনিং টেবিল। তৈজসপত্রগুলোও যেন কেমন চেনা চেনা।  বাবা এসে বসলেন ডাইনিংটেবিলে। সাদেক আজ বাবার সাথে কথা বলবেই, এরকম একটা দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে সাদেকও বাবার সাথে খেতে বসেছে। বাবার ঠিক উল্টোদিকের চেয়ারটায় বসে বারবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে সাদেক। কিন্তু বাবা চুপচাপ খাচ্ছেন। সাদেকের সাথে একবারও কথা বললেন না, একটা বার মুখটা তুলে তাকাননি তিনি। একবারও বাবার চোখে চোখ রাখতে পারেনি সাদেক। মনে হচ্ছে বাবা জানেনই না যে সামনে সাদেক বসে আছে। সাদেকের এবার সন্দেহ হলো, তার দৃষ্টিবিভ্রম মানে ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হয়নি তো? বাবা সত্যি সত্যি কি আছেন তার সামনে? ভুল দেখছে না তো? এরকম প্রশ্ন যখন সাদেকের মাথায় ঘুরছে তখনই বাবা একটু করে কাশি দিলেন। তারপর গলা খাকাড়ি দিয়ে একঢোক পানি খেলেন।
বাবা আবার খাচ্ছেন, টলটলে ডাল নিচ্ছেন, তাতে লেবু চিপে দিচ্ছেন, কিন্তু সাদেকের দিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। সাদেক বুঝতে পারছে সে বাবার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করেও পারছে না। বাবার নিরঙ্কুশ উপেক্ষা যেন সাদেকের কণ্ঠনালী, মগজকে উৎপাতহীন স্থবির করে রেখেছে।

বাবা সবসময়ই সময় নিয়ে ধীরে ধীরে খাওয়া দাওয়া করেন। তিনি বলতেন- খাওয়াটা একটা ইবাদত। খুব যত্ন করে, চুপচাপ খেতে হয়। সাদেকের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। তাই সে ডাইনিংটেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে কিচেনের সিঙ্কে হাত ধুতে ধুতে কিচেনের দরজার গ্লাস দিয়ে তাকিয়ে দেখে ব্যাকইয়ার্ডটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। ক’দিন আগেও এখানে কত সবজির গাছ ছিল। সাদেক কিচেনের দরজাটা খুলে দেখে ব্যাকইয়ার্ডের শিমগাছ, লাউগাছ, টমেটো গাছ সব মরে কালচে হয়ে গেছে। শীতের আগে ঠাণ্ডা যখন বাড়ে তখন এভাবেই সবজিবাগান মরে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে। সাদেক নিজের সাথে কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পায়। ঠাণ্ডা সাদেককে বেশিক্ষণ ব্যাকইয়ার্ডে দাঁড়াতে দেয়নি। ইতোমধ্যে বাবাকে ভুলে গেছে সাদেক। বাবাও আশেপাশে নেই।

ছয়
গত একসপ্তাহ ধরে খুব বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে শাওন। একদিকে প্রচণ্ড মানসিক চাপ অন্যদিকে শারীরিক পরিশ্রম। বাসার সব কাজ তো তাকে একাই সামলাতে হচ্ছে। হয়তো তার ছোট ফ্যামিলি। তাতে কী? বাজারে তো যেতে হয়? নিজের স্কুল, বাচ্চার স্কুল, রান্নাবান্না, বাচ্চাকে খাওয়ানো, গোসল করানো, পটি করানো লন্ড্রি করা, ঘর গোছানো। প্যান্ডেমিকের শুরু থেকে তো আর বাইরের কেউ বাসায় আসে না। আগে তো বেবিসিটার আপার ওপর অনেক কিছুই ছেড়ে দেয়া ছিল। ইরফানের অনেক কাজ সেই আপাই করতেন। শাওনের অনেক আত্মীয়ের বাচ্চার দেখাভাল করেছেন এই বাংলাদেশি আপা। নাম শিরিন সুলতানা, মাঝবয়সী,  শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত। রূপকথার পরীদের মতো একটা মেয়ে আছে তার। ওর নামও পরী। পরীর প্রতি মুগ্ধতার কারণে শিরিন সুলতানাও শাওনদের নেইবারহুডে ক্রমশ পরীর আম্মু হিসাবে পরিচিতি পেতে থাকে। পরীর আম্মুকে কখনো বাইরের লোক বলে মনে হয়নি শাওনের। নিউ ইয়র্কে  যখন করোনা তুঙ্গে, মানে গত জুন মাসে। তখন এক সকালে শিরিন আপার উৎকণ্ঠিত ফোন আপা পরীর আব্বুর করোনা পজিটিভ ধরা পড়ছে, অনেক শ্বাসকষ্ট। এম্বুলেন্স এসে এলমহার্স্ট হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমাদেরকে সাথে নেয় নাই। বলছে কেউ যেতে পারবে না। একটু আগে হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানাইছে- ওনাকে ভেন্টিলেটরে দিছে। ওরা এখনো কিছু বলতে পারতেছে না। বলছে জানাবে।

হাসপাতাল থেকে পরদিন সকালে ফোন করে জানায় পরীর আব্বু মারা গেছে। পরীর আম্মু, পরী ওরা দূর থেকে ওদের প্রিয়তম স্বামী ও বাবার লাশটা দেখেছে। ফিউনারেল সেন্টারের লোকজন ওদেরকে কাছে যেতে দেয়নি। দূরত্ব এবং চোখের জল এই দুইয়ে মিলে লাশের মুখটাকে আরও অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন করে তুলেছিল। হাসপাতালে যাওয়ার আগে অবচেতন অবস্থাতেই শিরিনের গ্লোভস পরা হাতে হাত রেখে পরীর আব্বু বলেছিল- ডোন্ট ওরি, ফিরে আসবো।  বিদায়বেলায় হাতের স্বাভাবিক স্পর্শটুকু পায়নি বলে অনেক আক্ষেপ করেছে শিরিন। হাসপাতালে নেয়ার সময় সবার মুখেই ছিল মাস্ক। শিরিন, পরী, পরীর বাবা কেউ-ই কারো মুখটা শেষবারের মত দেখতে পারেনি। বিদায়বেলায় প্রিয়জনের মুখখানা দেখতে না পারার দুঃখ এদের সবাইকে সারাজীবন যন্ত্রণাবিদ্ধ করবে সন্দেহ নেই। পরীর বাবাও হয়তো একই কষ্ট বুকে নিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু একথাও তো সত্য, মৃত্যু যখন আসে তখন কে প্রিয়জনের মুখটা প্রাণভরে দেখতে পেরেছে। মুখ দেখাদেখির মত অবস্থা কী আর তখন কোন পক্ষের থাকে!
শাওন পরীর আম্মুর কথা ভাবতে গিয়ে ভেতরে ভেতরে আরো কুঁকড়ে যাচ্ছিলো। ক্লান্ত দেহে অবসাদ, বিষন্নতা কখন যে তাকে গভীর ঘুমে ডুবিয়ে দিয়েছে টের পায়নি।
সূর্য তখনও পুবের দেয়ালটা বেয়ে উপরে উঠে আসে নি। একটু পরেই সে উঁকি দেবে। বালিশের পাশে রাখা ফোনটা অবিরাম বেজে চলেছে। ফোনের রিংটোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় ইরাফানের। তাই ইরফানই কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে- মাম ইয়োর ফোন ইজ রিংগিং।
শাওন অপরিচিত নাম্বার হলেও বুকেচাপা আশঙ্কা থেকেই ফোনটা ধরে- হ্যালো।
– ইজ ইট শাওন?
– ইয়েস, স্পিকিং, ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে শাওন।
– আই এম রিভেরা, আরএন ফ্রম এলমহার্স্ট হসপিটাল। উই আর ভেরি সরি, মিস্টার সাদেক ইজ নো মোর। উই ট্রাইড আওয়ার বেস্ট। হি ইজ ক্লিনিক্যালি ডেড নাউ। উই আর গোইং টু টেক হিম অফ ফ্রম ভেন্টিলেটর। সরি ম্যাম।

পরীর আব্বুর হাসপাতালে নেয়ার ঘটনার সাথে সাদেকের হাসপাতালে যাওয়ার ঘটনার মধ্যে এতটাই মিল ছিল যে, শেষ পরিণতির কথা ভেবে শাওন বিষয়টা মনে করতে চাইতো না। কিন্তু তারপরও আশঙ্কা ওকে তাড়া করেছে সবসময়। কিন্তু শেষটাতেও যে পরীর আম্মুর মতো যে তাকেও একই পরিণতি মেনে নিতে এটা ভাবেনি। ফোন রেখে শাওন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ইরফানকে বুকে জড়িয়ে আকাশ কাঁপানো চিৎকারে চারপাশের নিরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, বাতাসে ভেসে বেড়ানো করোনাভাইরাসও যেন কিছুটা থমকে গেলো, কান্নার তীব্রতায় ফোনে বেজে ওঠা ফজরের আজানের ধ্বনিও যেনো চাপা পড়ে গেল।

সাত
কিছুক্ষণ আগেই সাদেক বুঝতে পারলো, বাবাকে  নিয়ে তার অস্বস্তিটা আর আগের মতো নেই। মনে হচ্ছে মাকে নিয়ে স্বপ্নের মতো বাবা আর শাওনকে নিয়ে ঘটনাগুলোও স্বপ্ন। এখন বাবাই তার সাথে যেচে কথা বলছেন। তোকে নিয়ে অনেক টেনশনে ছিলাম আমি আর তোর মা। তুই যখন ভেন্টিলেটরে ছিলি তখন থেকেই তোকে দিনরাত্রি আগলে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হলো না রে বাবা। তোকে আমাদের সাথেই চলে আসতে হলো। এখন থেকে তুই আমাদের সাথেই থাকবি। আমি যখন তোদের ছেড়ে চলে আসি তখন তুই ছিলি নিউ ইয়র্কে। দুইবছর পর তোর মা যখন চলে এলো তখনও তুই নিউ ইয়র্কে।  তোকে একবার দেখার জন্য মনটা অস্থির হয়ে থাকতো। তুই নিউ ইয়র্কে যখন বেপরোয়া ঘুরতি, তোর মা তোকে মাস্ক ফেরি করার স্বপ্ন দেখিয়ে তোকে সতর্ক করেছে। যাক ওসব কথা।
সাদেকের মনে হলো, বরিশালে গ্রামের বাড়িতে কোনো একটা  বিছানায় সে শুয়ে আছে। তার একপাশে বসে আছে বাবা, অন্যপাশে মা।

আপনার মন্তব্য লিখুন