প্রতিরোধের কন্ঠস্বর ফকির আলমগীর

20185_me.jpg
লড়াইয়ের প্রাণ প্রতিরোধের কন্ঠস্বর ফকির আলমগীর। ফকির আলমগীর ষাটের দশক থেকে সংগীতচর্চা করেছেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি বংশীবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি তাঁর গান দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও গণশিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন–সংগ্রামে এবং উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। গণ–অভ্যুথান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের সামরিক শাসনবিরোধী গণ–আন্দোলনে তিনি শামিল হয়েছিলেন তাঁর গান দিয়ে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধায় চিরবিদায় জানানো হলো একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীরকে।
ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই প্রিয় স্বজনের অন্তিম যাত্রায় সমবেত হওয়ার। লকডাউনে বন্দীদশার নিয়তি মেনে নিতেই হয়।
এদিকে চট্টগ্রামে সারাদিন ধরে ভেজা আকাশ। মনটা বিষন্ন হয়ে আছে।
ফকির আলমগীর ছিলেন আমাদের সহযোদ্ধা, বড় ভাই। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সবার আগে। এমন অসাধারণ মানুষ, অভিভাবক আর কি পাবো?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উৎসমূলে রয়েছে বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের মৌলিকত্ব। বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলন তার অহংকার, তার আত্মপরিচয় ও জাতিসত্তা বিকাশের বাতিঘর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সূচিত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গতিধারা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে, রূপান্তরিত হয়েছে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশীদারে। বাংলার মুক্তিকামী মানুষের রাজনৈতিক দর্শনের শক্ত ভিত্তিও তৈরি হয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমি থেকে। সূত্রপাত ঘটেছে এক অসাম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরপেক্ষ,বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখার।
অথচ আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকাতে গেলে একটি কথা স্মরণ করতেই হবে যে, বাংলাভাষা ও সাহিত্য জন্ম থেকেই ‘বিদ্রোহী’; কোনো দিনই এই ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমাজের উঁচু শ্রেণির কাছ থেকে সহজে মর্যাদা পায়নি। লড়াই করে তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির সব মাধ্যমেই একটি বিষয় লক্ষণীয় যে সবকিছুকে ছাপিয়ে সেখানে বড় হয়ে উঠেছে বাস্তব জীবন, তার প্রতিবাদ, ক্ষোভ আর দ্রোহ। আর তাই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি জীবনধর্মী।
’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শের ওপর যখন নেমে আসে একের পর এক আঘাত, সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা মানুষ, স্বাধীনতা বিরোধী দানবদের তাণ্ডবে মানুষের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা—এমনই এক সময় ১৯৮৪ সালে শ্রদ্ধাভাজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের হাত ধরেই গড়ে ওঠে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, আলবদর, রাজাকার তথা মৌলবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট হয়ে ওঠে প্রতিরোধের, প্রতিবাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
প্রতিরোধের, প্রতিবাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রাণ ছিলেন ফকির আলমগীর৷
ফকির আলমগীর সমুদ্র শহর কক্সবাজারে শেষবার এসেছিলেন গত সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট – Combined Cultural Alliance  এর সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ ভাই সহ নৌকার পক্ষে কক্সবাজার, চকরিয়া ও মহেশখালীতে সাংস্কৃতিক সমাবেশে যোগ দিতে। এই কটা দিন খুব প্রানবন্ত আলাপ আলোচনায় মেতেছিলাম আমরা, আরিফ ভাই আর ফকির ভাই দুজনেই কথা শুরু করে আর শেষ হয়না আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি। কখনো ৭১ কখনো স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কখনো কবিতা পরিষদ, কখনো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জেট আবার কখনো ফকির ভাই কেন রাজনীতিবিদ না হয়ে শিল্পী হলেন।  সারাদিন অনুষ্ঠান শেষে রাতে একসাথে খাওয়া আবার সকালে নাস্তার টেবিলে আড্ডা শেষে ছুটে চলা উপজেলা গুলোতে। আজ ফকির ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
আমার রাজনৈতিক জীবন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথচলায় আত্মার আত্মীয়ের প্রস্থান। আমার দুঃসময়ের আশ্রয়ের ঠিকানা গুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের হেফাজত করুন।
ফকির আলমগীর ছিলেন মা, মাটি, মানুষের শিল্পী। মানুষ ও মাটির এমন আপনজন আর হবে না!
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতিকের পক্ষে প্রচার অভিযানে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির ভাই এই দেশের স্বাধীনতার মান সমুজ্জ্বল রাখতে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আমার হাতে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন।
আপনার প্রদত্ত দ্বায়িত্ব পালনে আমৃত্যু সরব থাকবো এটুকু কথা দিলাম শেষ যাত্রায়।
আজ যতবার ফকির ভাইয়ের ছবিতে চোখ রাখছি। ভেজা চোখ,শূন্যতায় ঘেরা মনে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসে মনে মনে বলেছি,
‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।
বিদায় মাটির মানুষ ফকির ভাই।
লেখক – সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, কক্সবাজার।
আপনার মন্তব্য লিখুন