প্রতিবন্ধী দিবসের ভাবনা : বর্ফী

morshed-mohammad-ali.jpg

মোরশেদ মোহাম্মদ আলী


“সুর্য ডোবার সময়ে কিছুক্ষণের জন্যে আকাশে ভোরের মতো রং দেখা যায়, যাতে মানুষ আশা করে কাল আবার সকাল হবে”। আশা এমনই এক শক্তি যা দুর্বলকে সাহস যোগায়। চরম প্রতিকূলতার মাঝেও আশা মানুষকে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখায়।

বর্ফী; বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ বসু নির্মিত বহু পুরস্কারে ভূষিত অসাধারণ হিন্দি ছবি। ফুল যে রকম না বলে ফোটে, কোনও উদ্দেশ্য ছাড়া দিনভর হেসে যায়, তারপর কাউকে না বলেই শুকিয়ে নুয়ে যায় ‘বর্ফী’ তেমনই এক ছবি। বর্ফী তেমনই এক চরিত্র। কিছু লিখব না, ছবির গল্প বা চরিত্র নিয়ে। এ ছবিতে এমনিই ৪৫ শতাংশের মতো কথা নেই। তাই আমিও কেবল কৌতূহলটুকুই লিখব, আবেগটুকুই লিখব। মুভিটি আসলে বাক কিংবা মানসিক ভাবে বিকারগস্থ মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনার প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি। প্রতিবন্ধকতা সত্বেও চলমান জীবনকে কিভাবে উপভোগ করতে হয় তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ এই অপূর্ব মুভিটি। মূলত একজন বাক প্রতিবন্ধী তরুণ ও আরেক অটিজম আক্রান্ত তরুণীর ছন্দময় জীবনের বহিঃপ্রকাশ এই চলচ্চিত্র। সমাজের খানিকটা পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর প্রতি মানবিক আচরণের দৃশ্য চলচ্চিত্রে রূপায়ণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই ফলপ্রসূ। চলচ্চিত্র আমাদের অনুভূতিতে, বিবেকের গহীনে ঠিকই সরাসরি ঢুকে পড়ে। শিল্পই একমাত্র পারে মানুষের মনে দাগ কাটতে, তাই শিল্পকেই সেই দায়িত্বটা নিতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে।

ষাটের দশকে আমেরিকায় প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে ১৯৯১ সাল থেকে অটিজমকে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়। অটিজম ও অন্যান্য স্নায়ুজনিত রোগের জটিলতা বর্তমান সময়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল চিকিৎসা সেবা দিয়ে অটিজম আক্রান্তদের রাতারাতি ভালো করা সম্ভব নয়। এই বিশেষ শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক সমস্যা সর্বোপরি প্রয়োজন সবক্ষেত্রে অটিজম ফ্রেন্ডলি বা অটিজম বান্ধব পরিবেশ।

প্রসঙ্গক্রমে সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আমার নিজ জেলা প্রাণের জেলা কক্সবাজারের সম্মানিত জেলা প্রশাসক, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বপ্নরথ অরুণোদয়’র প্রতিষ্ঠাতা জনাব কামাল হোসেন’র লেখা একটি নিবন্ধের কিছু অংশ হুবহু উল্লেখ করার প্রয়াস পাই এ কারণে যে, উনার বর্ণনা যেন প্রতিটি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর বাবা-মা’র তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি! “বিমানে উঠেই দেখলাম আমার নির্ধারিত আসনের সামনের দুটি আসনে বাবা-ছেলে বসা। মা তার বিপরীতে। চলনবলন-কথনে মনে হলো সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবার।শিশুটির বয়স পাঁচ-ছয় বছরের বেশী হবে না। ভীষণ চঞ্চল ও অস্থির প্রকৃতির। বিমানের আইলে (aisle) দাঁড়িয়ে হ্যান্ড লাগেজটি ওভারহেড লকারে রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু শিশুটির ছোটাছুটি অস্থিরতার কারণে পারছিলাম না। মা-বাবা প্রাণান্ত চেষ্টা করছিলেন তাকে সরাতে। বিমান ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণ পর আমার উইন্ডো সিট বরাবর সামনের সিটে বসে পেছন ফিরে আমাকে দেখছিল। আমি তাকাতেই আবার সরেও যাচ্ছিল।
কক্সবাজার-ঢাকা রুটে মাঝেমধ্যে গতিময় মেঘপ্রবাহ কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। তবে নভেম্বর-মার্চ সময়ে এটি কমই হয়ে থাকে। পাইলট ঘোষণা করছিলেন কেবিন ক্রু প্রিপার ফর ল্যান্ডিং। এ সময় আবারও বিমানে কিছুটা বাম্পিং হচ্ছিল। বিমানের পুরুষ কেবিন ক্রু দেখছিলেন সবার সিটবেল্ট বাঁধা আছে কিনা। আমার সামনে বসা শিশুটিকে তার মা বারবার চেষ্টা করছিলেন নির্ধারিত সিটে বসানোর এবং সিটবেল্ট বাঁধার। কিন্তু একেবারেই পারছিলেন না। শিশুটি চিৎকার করে কাঁদছিল। সে কোনোমতেই সিটে বসবে না, হাঁটাহাঁটি করবে। ক্রু বলছিলেন, ম্যাম আপনার কোলে নিয়ে সিটবেল্ট বাঁধুন। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, চেষ্টা তো করছি, পারছি না। ‘ম্যাম বাম্পিং হচ্ছে, ওর সিকিউরিটির জন্য সিটবেল্ট বাঁধতেই হবে’ কেবিন ক্রু বলছিলেন। নিরুপায় হয়ে ভদ্রমহিলা বলছিলেন, দেখুন আমার সন্তান স্পেশাল চাইল্ড, বুঝার চেষ্টা করুন। শিক্ষিত,লম্বা, সুদর্শন ক্রু অনেকটা বিরক্ত হয়ে বলছিলেন, ম্যাম স্পেশাল চাইল্ড দ্বারা কি বুঝাতে চাচ্ছেন? বুঝলাম না। তাকে তো সিটবেল্ট বাঁধতেই হবে! বাম্পিং হচ্ছে। তখন সন্তানকে কোলে জড়িয়ে শক্ত করে ধরলেন মা। অসহায়ত্বের বিষন্নতায় আচ্ছন্ন মায়ের দিকে তাকিয়েছিলাম। কেবিন ক্রু না পেরে চলে গেলেন।পরপরই চলে এলেন অন্য কেবিন ক্রু। বিরক্ত হয়ে তিনিও চলে গেলেন। স্পেশাল চাইল্ড বলাতে আমি একটু বিশেষ মনোযোগী হলাম পুরো ঘটনার প্রতি। এ বিশেষ শিশুদের ভালোবেসেই কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘অরুণোদয়’। শিশুটি কোনোভাবেই বসতে চাচ্ছিল না; দাঁড়াবে-হাঁটবে। মা তাকে জোরে বুকে চেপে ধরে অপলক দৃষ্টিতে সামনে চেয়েছিলেন। লক্ষ্য করলাম দুচোখ অশ্রুসিক্ত, গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়সম কষ্টের নোনাজল। অনুভব করলাম কত দুর্ভাগ্য আমাদের, স্পেশাল চাইল্ডের মানে কি তাও অনেকে জানিনা এখনো”। আমি উপরের বর্ণনার সুত্রে এটুকুই বলবো, শুধুমাত্র বিমান কেন সব ধরনের গণ পরিবহন সহ সকল ক্ষেত্রে মানবিকতার চর্চা বা সচেতনতার অভাবে কখনো কখনো দুর্ভোগ পোহাতে হয় বিশেষ শিশুগুলোর মা-বাবাদের।

 

অটিজম তো কোনো রোগই নয়, একজন মানুষের মনের অবস্থা, কিছু শর্ত। এই শর্ত গুলোর অনেকটাই সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, যার ফলে সারানোর প্রশ্ন আসে। শিশুকে সমাজের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্যে আজ কত রকমের থেরাপি; অকুপেশন থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, সেনসরি থেরাপি, বিহেভিয়ার থেরাপি। কি না বাচ্চা ঠিকমতো কথা বলবে, সঠিক আচরণ করবে, হাইপার এক্টিভিটি দেখাবে না, পাঁচজনের সাথে মিশতে পারবে, সমাজে-অনুষ্ঠানে-বাড়ীতে যেরকম ভাবে চলতে হয় সেভাবে চলবে। একজন অটিজম আক্রান্ত বাচ্চার বাবা-মা এসব রপ্ত করাতে গিয়ে একেক জন যোদ্ধার ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়। অসংখ্য তুচ্ছাতিতুচ্ছ অথচ দৈনন্দিন কাজ। এসব কাজ শেখানোর সময় সবচেয়ে কঠিন কাজটি হলো তার মনোযোগ আর দৃষ্টি ধরে রাখবার জন্যে অনর্গল তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এমনভাবে বুঝিয়ে বুঝিয়ে কথা বলে যাওয়া এবং এসব চর্চা যে কতটুকু কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা একমাত্র বিশেষ শিশুর মা-বাবারাই জানে। সুতরাং এই স্নায়ুক্ষয়ী দীর্ঘমেয়াদী পরিশ্রমে শিশুর অভিভাবককে উদ্বুদ্ধ করুন। আইনস্টাইন অটিস্টিক ছিলেন- এই ধরণের স্টুপিড উদাহরণ না দিয়ে এভাবে শ্রম আর সময় দেয়ার পর শিশুর উন্নতি দেখলে তাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করুন। অটিজমে আক্রান্ত মানুষের চাহিদাগুলো অপ্রাসঙ্গিক, বাঁধন ছেড়া নয়।সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, শব্দ -আলো-গন্ধ ইত্যাদির অহেতুক ব্যবহার বন্ধ হওয়া কোনটাই ভুল নয়।
সমাজেরও থেরাপি প্রয়োজন। সমাজকেও অটিজম অবস্থাটির সঙ্গে নিজেকে অভিযোজিত করতে হবে। দায়িত্বটা কেবলমাত্র মা-বাবার নয়, যাদের বাড়ীতে এরকম বাচ্চা অটিজম ডায়াগনোসিস হয়েছে। এখনো সময় আছে; সমাজ যদি অটিজম আক্রান্ত মানুষ ও পরিবার গুলোর সাথে নিজেকে অভিযোজিত না করে তবে শিশুদের একটা বড় অংশ মুল সমাজ থেকে দুরে চলে যাবে এবং কলেবর বৃদ্ধি পাবে। ইট ইজ ভেরি এলার্মিং!

অটিস্টিক শিশুর আচরণের মূল কারন যোগাযোগের সমস্যা। আমরা শুধু তাদেরকে বাইরে থেকে লক্ষ্য করি, তাদের জগতের গভীরে প্রবেশ করতে পারিনা। প্রায় অর্ধেক অটিস্টিক শিশু কথা বলতে পারেনা, পারলেও ঠিকমত মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেনা। ঠাট্টা বা বাগধারা বোঝেনা। অক্ষমতার কারনে তাদের নিজেদের দুঃখ,আনন্দ,চাহিদা, আবেগ অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় নানাবিধ অনাকাংখিত আচরণের মাধ্যমে যেমন অত্যন্ত চঞ্চল ও অস্থির থাকা, ভয় বা উত্তেজনা বশত দুহাত নাড়ানো, শরীর দোলাতে থাকা, সারারাত না ঘুমিয়ে ভোরের দিকে ঘুমোতে যাওয়া, বিভিন্ন জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দেয়া, নিজ হাতে কামড়ানো, নিজ মাথায় আঘাত করা, অন্যকে আঘাত করা ইত্যাদি। ব্যক্তিভেদে অটিজমের বিভিন্ন রকম উপসর্গ দেখা দেয় এবং উপসর্গের তীব্রতাও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। কেউ হয়তো কিঞ্চিৎ সহযোগীতা ও প্রশিক্ষণ পেলেই সমস্যাগুলো অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে পারে, আবার কাউকে হয়তো পুরোপুরিই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। উপসর্গের এমন ভিন্নতার কারণে বর্তমানে ‘অটিজম’ শব্দটির পরিবর্তে ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

একবার কলকাতা হয়ে চেন্নাই যাচ্ছিলাম মাইশুর সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ট্রেনে আমার অটিজম বহনকারী ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসার ব্যাপারে। সাঁতরাগাছি স্টেশনের প্লাটফর্মে সন্ধ্যা নাগাদ যথাসময়ে ট্রেন এসে থামলো। তার এক হাত আমার হাতে ধরা অন্য হাতে লাগেজ টেনে উঠতে যাচ্ছিলাম নির্দিষ্ট বগিতে; হঠাৎ চোখের পলকেই হাত ফসকে দৌঁড় দিল, হারিয়ে যাচ্ছিলো ব্যস্ততম প্লাটফর্মের হাজারো অচেনা মানুষের ভীড়ে, তাও আবার বিদেশে অচেনা পরিবেশে। আমার বুকের বাঁ পাশে বেশ জোরে জোরে ঝাঁকুনি অনুভব করছিলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি! পরিবারের অন্যদের এক জায়গায় রেখে হাতের সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে তার পিছু নিলাম ক্ষীপ্র গতিতে উদ্ভ্রান্তের মতো। অবশেষে তাকে ধরে ফেললাম; ফিরে পেলাম আল্লাহর অশেষ দয়ায়। আমার টানটান শিরা-উপশিরা একটু ঢিলে হলো। এরকম অনেক চরম শ্বাসরুদ্ধকর-উৎকন্টাময় পরিস্থিতির সম্মুখীন আমাকে বহুবার হতে হয়েছে এবং এসব চরম বাস্তবতা অটিজমের সাথে বসবাসের। যাক অটিজম আক্রান্ত শিশুর পিতামাতা কিরকম জীবন যাপন করেন, তারা ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। অনুরোধ, তাদের প্রতি কোনরূপ সান্ত্বনাবাণী দেবেন না। তাদেরকে এই সমস্যা মোকাবেলায় আন্তরিকতার সাথে সহযোগিতা করুন। এটা দৈবক্রমে সেরে যাবার সংকট নয়, আর বাবা-মাদের করণীয় হলো মনকে বেঁধে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে শিশুটির সঙ্গে কঠোর পরিশ্রমসাধ্য কার্যকর সময় ব্যয়। অটিজমের পথে হাঁটা এতো সহজ কাজটি নয়। আপনাকে এই কাজটি সমর্পন করা হয়েছে আপনি পারবেন বলে। এই অতিমাত্রায় অসহায় শিশুর দায়িত্ব আপনাকে দেয়া হয়েছে, কেননা প্রকৃতি জানে আপনিই সেই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল, যে ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে সন্তানকে আগলে রাখবেন।

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানদের হ্যান্ডল করার সবচাইতে কঠিন বেদনাদায়ক এক কষ্টসাধ্য অধ্যায় হলো বয়ঃসন্ধি কাল যা একমাত্র অটিজমের রাজ্যে বসবাস করা মা-বাবা ছাড়া অন্য কারো উপলব্ধি করবার অনুভূতি বা সক্ষমতা প্রকৃতি হয়তো দেয়নি। এদের যে স্বাভাবিক কিশোর-কিশোরীদের মতো আবেগ-অনুভূতি থাকে, যা হয়তো তারা বোঝাতে সক্ষম হয় না, সেটা অনেকেই বুঝতে পারেন না বা বোঝার চেষ্টা করেন না। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের আমূল দৈহিক পরিবর্তন আসে। অন্যদের মতো অটিস্টিক কিশোর-কিশোরীরা বলে বোঝাতে পারে না তাদের কোথায় সমস্যা হচ্ছে বা কী করলে তাদের খারাপ লাগাগুলো দূর হবে। এ বিষয়গুলো মৌখিকভাবে বোঝাতে না পারা বা নিজেকে মানিয়ে নেয়ার অক্ষমতার কারণেই দেখা দেয় বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, যা সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ মানুষের জীবনে এ রকম পরিবর্তন স্বাভাবিক নিয়মেই হয় কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর-কিশোরী এবং তাদের বাবা-মা’র জন্যে এটা একটা মহাযুদ্ধ।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের সুরক্ষায় সেফটি প্ল্যান কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমস্ত ধরনের শিশুকেই বিপদ থেকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।এর মধ্যে যে সমস্ত শিশু অটিজম বাহী তাদের প্রতি অতিমাত্রায় দায়িত্ববান হতে হবে। অটিস্টিক শিশুদের সোশ্যাল, কমিউনিকেশন ও বিহেভিয়র সমস্যাগুলো থেকেও তাদের সেফটি নিয়ে আগে ভাবতে হবে আমাদের।
বিপদ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা, মস্তিস্কে তথ্য ঠিকমত না পৌঁছানো, ভয়, ব্যাথা এসব সম্পর্কে কোন অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারা অটিজম আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তিদের মধ্যে দুর্ঘটনার শঙ্কা অনেক বেড়ে যায়; শিশুর সাথে অবশ্যই তার সম্পর্কে ডিটেইলস লেখা আইডেন্টিটি কার্ড মোবাইল নাম্বার সহ রাখতে হবে বিশেষ করে স্কুলে এবং কোথাও ভ্রমণে গেলে। বাড়িতে সেফটি পরিকল্পনা শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি যে অটিজম চাইল্ডদের ক্ষেত্রে বাড়ি হলো সবচাইতে বিপদজনক জায়গা। তাই বাড়িতে স্পেশাল চাইল্ড থাকলে বাড়িকে আপনার চাইল্ড এর উপযোগী সুরক্ষিত জায়গা করে তুলতে হবে। ঘরে এমন কোনো ভারী ফার্নিচার দোদুল্যমান অবস্থায় রাখবেন না যা শিশু নাড়া চাড়া করলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। আসবাবপত্রে কাঁচের ব্যবহার বা ঘরে কাঁচের দরজা-জানলার আধিক্য কমিয়ে আনতে হবে। এলসিডি টিভি, স্ট্যান্ড ফ্যান এগুলো শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন। ঘর পরিষ্কার করার সমস্ত প্রোডাক্ট গুলো এক করে কোনো লকারের ভেতর রাখুন। ঘরের দরজা তালা মেরে রাখুন ভেতর থেকে যখন আপনি কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। ঘরে শিশুর কাছাকাছি পানি গরম করার হিটার বা অন্য কোনো গরম জাতীয় বস্তু রাখবেন না যাতে হাত দিলে পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কারণ এসব শিশুদের ঠাণ্ডা-গরম অনুভূতি কম থাকে। এছাড়া আরো নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে নোট করে রাখুন এবং সেই অনুযায়ী সেফটি পরিকল্পনা করুন। আদরের সন্তানকে পরম নিরাপত্তায় আগলে রাখুন।

অটিজম কোনো রোগ বা অক্ষমতা নয়, বরং একে বিশেষ ধরনের সক্ষমতা বলা চলে। সেই সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ করে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই স্পেশাল মানুষগুলোকে উপেক্ষা না করে কাছে টেনে নিতে হবে, প্রত্যাখ্যান নয় সমর্থন ভীষণ প্রয়োজন। তবেই তারা তাদের সামর্থ্যগুলোর পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবেন। আপনার আশেপাশের কোন পরিবারে এরকম সন্তান থাকলে আজ থেকে সেই পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিন। সমাজের সচেতনতা ও আন্তরিক সহযোগিতাই এই উদ্বেগজনক সমস্যার প্রথম এবং প্রধান সমাধান সূত্র।

(লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার সমিতি চট্টগ্রাম)

আপনার মন্তব্য লিখুন