পানের টানে পান ভাণ্ডারে

bhairab-1.jpg

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার গজারিয়া বাজারে মোশারফ হোসেন রাজুর ‘দয়াময় পান ভান্ডার’-এর পান।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে স্বাদ ও গন্ধের ২০ ধরনের মিষ্টি পান বিক্রি করে আলোড়ন তৈরি করেছেন মোশারফ হোসেন রাজু নামের এক দোকানি। তাঁর সেই পান খেতে তরুণ/যুবক/বয়স্ক-সবাই ছুটে আসেন ‘দয়াময় পান ভাণ্ডার’ নামের দোকানটিতে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে হাজারো খিলি পান বিক্রি হয়।

প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির সঙ্গে পানের সম্পর্ক। সাধারণত গ্রাম বা শহরের বয়স্ক মানুষরা পান খেয়ে থাকেন। পানের সঙ্গে সহযোগ হিসেবে থাকে সুপারি, চুন, খয়ের। কেউ কেউ তামাকপাতা বা জর্দাও খেয়ে থাকেন পানের সঙ্গে।

মোশারফের বাহারি মিষ্টি পানে এমন তিন-চার প্রকারের উপকরণ নয়, থাকে ১৫ থেকে ১৬ প্রকারের উপকরণ। যা তৈরি করা পানের খিলিকে করে তোলে অন্যরকম অপূর্ব স্বাদ ও মোহনীয় গন্ধে। যার টানে উপজেলার গজারিয়া বাজারে প্রতিদিন ছুটে আসেন শত শত মানুষ।

মোশারফের পানের প্রতিটি খিলিতে থাকে লং, এলাচ, দারুচিনি, কালোজিরা, জ্যৈষ্ঠমধু, সোনাপাতা, হরতকি, বয়রা, তুম্মা, কিসমিস, আদা, মধু, নানাজাতের বাদাম, মোরব্বা, কমলা ও মাল্টার গন্ধ। মূল্যভেদে পানের খিলিতে এইসব উপকরণ দেওয়া হয়। প্রতিটি পানের খিলি বিক্রি করেন ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার গজারিয়া বাজারে পান বিক্রিতে ব্যস্ত মোশারফ হোসেন রাজু। ছবি : এনটিভি

আমাদের দেশে বাংলাপান, মিঠাপান, ছাঁচিপান, লালিপান, কর্পূরীপান, খাসিয়াপান ও গাছপান-এই সাত প্রকারের পান চাষ হয়। পানের রস হজমে সহায়তা করে, রুচি বৃদ্ধি করে এবং মুখের দুর্গন্ধ নাশক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু মোশারফ তাঁর পানকে বিভিন্ন উপকরণ আর মসলা যোগ করে সেটিকে করেছেন ২০ প্রকার। আর বাহারি আকর্ষণীয় ২০ প্রকারের নামগুলোর উদ্ভাবকও তিনি নিজেই বলে জানালেন।

মোশারফের দোকানে পাওয়া যায় বিকেলের পান, সন্ধ্যা রাত্রির পান, বৌ-সোহাগী পান, কোমল-মিঠা পান, শিশির ভেজা পান, ছাত্রবন্ধু পান, হেভিস্পিড পান, দেবর-ভাবি পান, শালী-দুলাভাই পান, বাদশা পান, আগুন পান, খুসবু পান, ভালোবাসার উপহার পান, পথ চলার সাথী পান, চাঁদ বদনী বধূ পান, বেনারসী পান, ইয়াং পান, নিঝুম পান, ডায়সল্ট পান, হিরমালাই পান ইত্যাদি।

মোশারফ হোসেন রাজু জানান, তিনি ১০ বছর যাবত স্থানীয় গজারিয়া বাজারে এই বাহারি পান বিক্রি করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত তিনি পান বিক্রি করে থাকেন। এরমধ্যে বিকেলে তাঁর বিক্রি বেড়ে যায়। এ সময় মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে বিভিন্ন এলাকার পান বিলাসিরা তাঁর দোকানে ভিড় করেন। যাদের অধিকাংশই এমনিতে পান খান না। শুধু তাঁর দোকানের পান খেতে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আসেন। খেয়েও যান, নিয়েও যান।

মোশারফ জানান, স্বাভাবিক সময়ে গড়ে তাঁর ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি হয়। তবে ঈদ, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসবে তাঁর বিক্রি বেড়ে যায় বহুগুণ। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও হোটেলে অনুষ্ঠিত বিয়ে, জন্মদিন, সুন্নাতে খৎনা ও হালখাতার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে পান বিক্রি করতে যান ভৈরব, আশুগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। ওইসব অনুষ্ঠানে ৫০০ থেকে হাজার পিস পান বিক্রি হয় তাঁর।

পুরান ঢাকার নাজিরা বাজারে মোশারফদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল স্যান্ডেল তৈরির। সেখানে রাত জেগে কাজ করতে হতো। এজন্য তিনি রাগ করে বাড়ি চলে আসেন। ঢাকায় থাকাকালীন নাজিরা বাজারে এক লোক এই বাহারি পান বিক্রি করতেন। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে মানুষজন সেই পান খেতেন। তিনি নিজেও প্রায়ই সেই পান খেতে যেতেন। সেখান থেকেই তিনি অনুপ্রাণিত হন এই বাহারি পান বিক্রির।

স্থানীয়সহ আশেপাশের পানের ক্রেতারা জানান, মোশারফ হোসেন রাজুর এই বাহারি স্বাদ ও গন্ধের মিষ্টি পান তাঁদের খেতে বেশ ভালো লাগে। তাই তাঁরা নিজেরা খান। পরিবারের লোকজনের জন্য ৫-১০ খিলি করে কিনে নিয়ে যান। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে করে নিয়ে এসে খাওয়ান। এ ছাড়াও বাড়িতে মেহমান এলে বা কোনো অনুষ্ঠান হলে আপ্যায়নের জন্য এই পান কিনে নিয়ে যান। আগত মেহমানরা এই পান খেয়ে অনেক খুশি হন।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার গজারিয়া বাজারে পান বিক্রিতে ব্যস্ত মোশারফ হোসেন রাজু। ছবি : এনটিভি

স্থানীয় কৃষক লোকমান মোল্লা জানান, তিনি প্রতিদিন মোশারফের দোকানের পান খান। খুবই ভালো লাগে এই পান।

পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের মাধবদী গ্রামের তরুণ রকি হাসান জানান, মোটরসাইকেল করে বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এই পান খেতে আসেন। নিজেরা খেয়ে যান আর অন্য বন্ধুদের জন্য ৫/১০টি করে নিয়ে যান।

ভৈরব শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার যুবক পলাশ ও নাজির জানান, তাঁরা কেউ-ই পান খান না। তবে সুযোগ পেলেই তাঁরা এখানে আসেন এবং দাঁড়িয়ে থেকে দুই-একটি করে পান খেয়ে যান। এই মিষ্টিপান মুখে দিলে একটা অন্যরকম অনুভূতি জাগে তাঁদের মধ্যে।

আপনার মন্তব্য লিখুন