৭ বছর ধরে ৮ সেক্টরে কাজ পাচ্ছে একই ঠিকাদার

পদ্মা অয়েল যেন দুর্নীতির হাট

chittagong-padma-oil-company-limited-corruption-1.jpg

মুহাম্মদ আজাদ

সরকারি জ্বালানি বিপণন কোম্পানি পদ্মা অয়েলের কার্যক্রমে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। গত সাত বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির আটটি সেক্টরেই কাজ করে যাচ্ছে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতি দুই বছর পর পর দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সে নিয়ম মানাই হচ্ছে না সাত বছর ধরে। আট সেক্টরেই একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বহাল রাখার জন্য যখনই দরপত্র আহ্বান করার সময় আসে, ঠিক তখনই শ্রমিকদের মধ্যে সুকৌশলে উত্তাপ ছড়িয়ে নাটকীয় সব কাণ্ডকারখানা ঘটানো হয়। আর বছরের পর বছর এর নেপথ্যে রয়েছে দুর্নীতিবাজ তিনটি পক্ষের একটি সম্মিলিত চক্র। এই তিন পক্ষ হল পদ্মার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, সিবিএ নেতা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী দরপত্রের মাধ্যমে নতুন করে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর কথা থাকলেও পদ্মা অয়েল কোম্পানি মানছে না এসব নিয়ম। গত সাত বছরেও করা হয়নি নতুন কোনো দরপত্র আহ্বান। সেখানে বলবৎ থাকা ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও প্রতি বছর সেখানকার কর্মচারী সংগঠনের শ্রমিকদের মাধ্যমে একটি সাজানো ‘গণ্ডগোল’ পাকিয়ে তৈরি করা হয় একটি ইস্যু। এরপর ওই ইস্যু টেনে বাতিল করা হয় দরপত্রের আহ্বান। পরে সুকৌশলে আগের চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকেই পুনরায় বলবৎ রেখে পদ্মা অয়েলের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে পদ্মা অয়েলে আটটি সেক্টরে আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের কার্যাদেশই চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে চট্টগ্রামের ইপিজেড থানাধীন গুপ্তখাল এলাকায় পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান স্থাপনায় এমন সব অবিশ্বাস্য অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য মিলেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পদ্মা অয়েলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত দুই বছর মেয়াদ ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে নানা ‘ইস্যু’ টেনে অস্থায়ী শ্রমিকদের মাঝে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি করে পদ্মা অয়েলের শ্রমিক সংগঠন। এই পরিকল্পিত উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরির মূল কারণ মূলত একটিই— সেখানে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাদেশ বলবৎ রাখা। এসব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সরাসরি যোগসাজশে পদ্মা অয়েলের কিছু কর্মকর্তা ও শ্রমিক সংগঠন সিবিএর শীর্ষ কয়েকজন নেতা। এই তিন সিন্ডিকেটের যৌথ তৎপরতায় দীর্ঘদিন ধরেই পদ্মা অয়েলে চলে আসছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের অন্তত আটটি সেক্টরে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত হচ্ছে না। অথচ দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি দুই বছর পর কার্যক্রম পরিচালনা করার নিয়ম থাকলেও সেটা মানা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— দক্ষ হ্যান্ডলিং, দক্ষ-অর্ধদক্ষ হ্যান্ডলিং, জেটি হ্যান্ডলিং, পরিবহন ঠিকাদার, বিটুমিন সরবরাহ ঠিকাদার, শ্রমিক পরিবহন বাস সরবরাহ, প্রাইভেট কার সরবরাহ ও পেট্রোলিয়াম পরিবহন সরবরাহ। জানা গেছে, পদ্মা অয়েলে দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনা দরপত্রে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হ্যান্ডেলিং গ্রুপ-এ, গ্রুপ-ডি এর দরপত্র আহ্বান করে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। দরপত্রের নিয়ম মেনে কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল ইএনএসএস এন্টারপ্রাইজ নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি না দিয়ে একই সঙ্গে দরপত্র দেওয়া হায়দার কন্সট্রাকশনকে দেওয়া হয়েছিল কার্যাদেশটি। অথচ ওই কার্যাদেশের মূল্য ধরা হয় সর্বনিম্ন দরদাতার প্রায় দ্বিগুণ— ৯৬ লাখ ১৪ হাজার ৯২৬ দশমিক শূন্য চার টাকা। ওই সময়ে কাজের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তখনকার সহকারী জেনারেল ম্যানেজার ও বর্তমান ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) আবদুস সোবহান। এই কর্মকর্তাও পদ্মা অয়েলের আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতোই একই ‘রেওয়াজ’ পালন করে আসছেন তিনিও। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে ওই হায়দার কনস্ট্রাক্টশন নামের প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেই যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদার বলেন, প্রতিবারই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সেখানে কর্মরত অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে একটা গন্ডগোল পাকানো হয়। পরে সেটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় নতুন দরপত্র আহ্বান। দরপত্র না দেওয়ার নেপথ্যে পদ্মার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাশপাশি কয়েকজন সিবিএ নেতা সরাসরি জড়িত— এমন অভিযোগ করে ওই ঠিকাদাররা বলেন, মূলত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতির পথ চালু রাখতে নাটকীয় সব কাণ্ডকারখানার আশ্রয় নেন তারা।

পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদুর রহমানকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মোবাইলে এতো বেশি কিছু বলা যায় না। আপনি অফিসে সরাসরি এসেই কথা বলুন। বিষয়টি বোঝাতে বা আপনার বুঝতে সহজ হবে।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান সামছুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সেখানকার এমডির সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এরপরও আমি খোঁজ নিচ্ছি।’

সূত্র – চট্রগ্রাম প্রতিদিন অনলাইন

আপনার মন্তব্য লিখুন