চকরিয়ায় বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে অবৈধ করাতকলে, মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি!

IMG_20201206_201042.jpg

মোঃ নিজাম উদ্দিন, চকরিয়া:
চকরিয়ায় বনাঞ্চলের গাছপালা গিলে খাচ্ছে অবৈধ করাতকলগুলো। মহাসড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্নিকটের করাতকলে বাড়ছে ঝুঁকি। গাছ বোঝাই গাড়ি প্রবেশ করায় ঘটছে দুর্ঘটনা। মহাসড়ক কিনারায় গাছের স্তুপে আতঙ্কে যাতায়াত শিক্ষার্থীসহ সাধারণ লোকজন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডজনাধিক অনুমোদন বিহীন করাতকলের রাজত্ব চলছে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ও তার পার্শ্ববর্তী লামার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে। এগুলোর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কোনপ্রকার পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের। অথচ করাতলগুলো প্রতিনিয়ত গিলে খাচ্ছে সরকারি বনাঞ্চলের গাছপালা। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ আওতাধীন এলাকায় চলছে এসব করাতকল। কোনপ্রকার আইনকানুন তোয়াক্কা না করে অবৈধ করাতকলগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে বলেও জানিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম।

সরেজমিনে, উপজেলার ডুলাহাজারা বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে মহাসড়ক ঘেঁষে সম্প্রতি নির্মাণ করলো ঝুকিপূর্ণ করাতকল। এটির মালিক স্থানীয় রংমহল এলাকার মৃত আবু বক্করের ছেলে আক্তার আহমদ সওদাগর বলে জানা গেছে। দেশে এমনিতেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সারি লম্বা হচ্ছে তার উপর চলছে মহাসড়কে অসতর্কতা। ব্যস্ততম মহাসড়কের অতি সন্নিকটে করাতকলটি হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কে চলাচল করছে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় জনগণ। এছাড়া এ করাতকলের পঞ্চাশ মিটারের মধ্যে রয়েছে ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট নামের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ করতকল ব্যবস্থাপনা আইন- ২০১২ অনুযায়ী কোন শিক্ষাপ্রতিষ্টান ও পরিবেশের ব্যঘাত ঘটে জন গুরুত্বপূর্ণ এমন স্থানের ২০০ মিটারের মধ্যে কোনপ্রকার করাতকল নির্মাণের কোনপ্রকার নিয়ম নেই। গত কয়েক মাস আগেও দূর্ঘটনা ঘটে এই করাতকলের সামনে। মহাসড়ক থেকে করাতকলের গাছের গাড়ির কারণে দুটি ব্যাটারী চালিত টমটম মুখোমুখি সংঘর্ষে নারীসহ চার যাত্রী গুরুতর আহত হয়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ব্যস্ততম এ মহাসড়ক কিনারায় ঝুকিপূর্ণ এ অবৈধ করাতকল অপসারণের দাবি সচেতন মহলের।
মহাসড়ক কিনারায় করাতকল বিষয়ে মালুমঘাট হাইওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মোর্শেদুল আলম চৌধুরী বলেন, মহাসড়কের উভয় পাশের নির্দিষ্ট জায়গায় যানবাহন ও জন চলাচলে ব্যঘাত সৃষ্টি হয় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে আইনের আওতায় আনা হবে। আকতার সওদাগরের ঝুকিপূর্ণ করাতকলের গাছের টুকরো মহাসড়ক সীমানা থেকে অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয় সুত্রে জানায়, ডুলাহাজারা ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ডজনাধিক স’মিলে দিনরাত চলছে বনের কাঠ চিরাই। বিভিন্ন কলাকৌশলে বনাঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত গাছ যাচ্ছে ওসব করাতকলে।
সচেতন মহলের অভিমত, অবৈধ এসব করাতকল উচ্ছেদ না হলে বনের গাছপালা কিংবা বনাঞ্চল রক্ষা কিছুতেই সম্ভব হবে না। যদিও ইতিপূর্বে দেশের বনভূমির বিশাল একটি অংশ গাছশুন্য হয়ে দখলবাজদের নেতৃত্বে জনভূমিতে পরিনত হয়েছে। যদি এভাবে চলতে থাকে বনভূমির চিহ্ন মুছে যাবে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে। তবে সম্প্রতি বনভূমি উদ্ধার, উচ্ছেদ, জব্দ করে বন বিভাগের মধ্যে এখন অনেকটা তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, লামার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি করাতকল মালিকদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী গাছ চোর সিন্ডিকেট। তাদের মাধ্যমে প্রতিরাতে বনের কাঠ পাচার হচ্ছে। আবার সেই কাঠ দিয়েই চলছে তাদের অবৈধ করাতকলের ব্যবসা। আর এসব অপকর্মে ম্যানেজ করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট তদারকি দায়িত্বরত লোকজন। সাগরের বোট তৈরির কারখানা মালিকদেরও অত্যন্ত প্রিয় ফাঁসিয়াখালীর অবৈধ করাতকলগুলো। প্রভাবশালী এ সিন্ডিকেট শুধু বনের গাছ নয় দীর্ঘ সময় ধরে বনের হরিণ শিকার করেও যাচ্ছে। গত কয়েকদিন আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেশকিছু হরিণের মাংস জব্দ করে। গুলিস্তান বাজার এলাকার এক ব্যক্তিকে সাজাও দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ ইউনিয়নে হাতি মৃত্যুর ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই যাচ্ছে।
মহাসড়ক কিনরায় করাতকল মালিক আকতার আহমেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন প্রশ্নের উত্তর দেননি। বরং অদৃশ্য শক্তির অনুবলে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেন।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ সোহেল রানা বলেন, পরিবেশ নষ্ট করে, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নিকটস্থ কোনপ্রকার করাতকল নির্মান করা যাবে না। আইনভঙ্গ করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না, সে যেই হউক। এ বিষয়ে অতিসত্বর অভিযান চলবে বলেও তিনি জানান।

আপনার মন্তব্য লিখুন