করোনার মধ্যেও জাপান মাতাচ্ছে ‘পিশাচ হন্তারক’

httpsthecmbd.com_-2.jpg

‘ডেমন স্লেয়ার’ নামের কমিকস বইয়ের একটি সিরিজ অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘কিমেৎসু নো ইয়াইবা: মুগেন ট্রেন’ নামের অ্যানিমেশন ছবিটি। জাপানের বিভিন্ন সিনেমা হলে ছবিটি প্রদর্শিত হচ্ছে। এমনই একটি সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন দর্শক। ২২ অক্টোবর, টোকিওছবি: রয়টার্স

 

জাপানে এখন করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় প্রতিদিন নতুন রেকর্ড গড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর হিসাব। রোববারের হিসাবে রাজধানী টোকিওতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৫৮৪, এক দিনের হিসাবে যা নতুন রেকর্ড। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ১৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, মৃত্যুর যে হিসাব নভেম্বর মাসজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে বেশি। ফলে করোনা সংক্রমণের আবার ফিরে আসা নিয়ে জাপানে অনেকেই এখন উদ্বিগ্ন।

এমন পরিস্থিতিতেও সরকার লকডাউন কিংবা জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো পদক্ষেপে ফিরে যেতে চাইছে না। এর বদলে সরকার অর্থনীতি সচল রাখার উদ্দেশ্যে নাগরিকদের প্রতি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক পদক্ষেপ মেনে জীবনযাপনের আহ্বান জানাচ্ছে। জাপানের লোকজনও সরকারের সেই পদক্ষেপে সাড়া দিয়েছেন। একেবারে ঘরে বসে না থেকে বাইরের জীবন কিছুটা হলেও উপভোগ করে চলেছেন তাঁরা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের রেকর্ডসংখ্যক দর্শক টানার ঘটনায়।
কার্টুন ছবিটির মূলে আছে ‘ডেমন স্লেয়ার’ বা ‘পিশাচ হন্তারক’ নামের কমিকস বইয়ের একটি সিরিজ। শুরুতে ২০১৬ সালে একটি কমিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়ার পর অল্প দিনের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে এর ২৩তম খণ্ড প্রকাশিত হলে করোনা–ভীতি উপেক্ষা করে লোকজনকে এটি কেনার জন্য বইয়ের দোকানে লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কমিকস বই জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর কাহিনির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তৈরি অ্যানিমেশন ছবিটি মুক্তি পেয়েছে কিছুদিন আগে। দেশজুড়ে করোনা-ভীতি চলতে থাকা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে এটি জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি বক্স অফিস রেকর্ড গড়ে নিয়েছে।

কমিকসের গল্পের পটভূমি প্রায় ১০০ বছর আগের জাপানকেন্দ্রিক। তানজিরো কামাদো নামের এক বালক যেখানে বাড়ি ফিরে এসে দেখতে পায়, তার একমাত্র ছোট বোন নেজুকো ছাড়া পরিবারের সবাই পিশাচের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, জীবিত ছোট বোনও পিশাচে পরিণত হয়েছে। তখন থেকে তানজিরো বোনকে কীভাবে মানুষের জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় এবং পিশাচদের কীভাবে হত্যা করা যায়, সেই যুদ্ধে নিয়োজিত। কমিকসের কাহিনিতে পুরো দলটি ডেমন স্লেয়ার যোদ্ধা নামে পরিচিত এবং ২৩ খণ্ডে তাদের নানা রকম বীরত্বের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে অ্যানিমেশন ছবি ‘কিমেৎসু নো ইয়াইবা: মুগেন ট্রেন’–এর কাহিনিও এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও নাটকীয়তার ছোঁয়া আরও কিছুটা বর্ণাঢ্য করে নিতে কাহিনির আংশিক রদবদল সেখানে করা হয়েছে। জাপানি ভাষার শব্দ মুগেনের অর্থ হচ্ছে অনন্ত বা সীমাহীন। আর কিমেৎসু নো ইয়াইবা হচ্ছে পিশাচের হত্যাকারী। সেই ছবির কাহিনি ট্রেনের যাত্রীদের প্রাণ রক্ষার কাজ করা নায়কের ওপর কেন্দ্রীভূত। জাপানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সময় মুক্তি পাওয়া ছবিটি বক্স অফিস জনপ্রিয়তার দিক থেকে মাত্র ৪৫ দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর্শক আকৃষ্ট করা ছবিতে পরিণত হয়েছে। ছবির বিতরণ কোম্পানি আনিপ্লেক্স ইঙ্ক ও তোহো কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ দিনে এই ছবি থেকে আয় হয়েছে আনুমানিক ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। জাপানে সবচেয়ে বেশি আয় করতে পারা ছবির তালিকায় হলিউডের ছবি ‘টাইটানিক’কে স্থানচ্যুত করে এটি দুই নম্বরে উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি আয় হওয়া ১ নম্বর ছবির স্থান এখনো ধরে রেখেছে অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং অ্যানিমেশন ছবির অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিচালক মিয়াজাকি হায়াওর ২০০১ সালের ছবি ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’।

করোনাকালে যখন বড় কোনো হলঘর কিংবা প্রেক্ষাগৃহের মতো মিলনায়তনে জড়ো হওয়ার বেলায় নানা রকম সতর্কতামূলক উপদেশ জাপান সরকার দিয়ে চলেছে, সে রকম সময়ে সতর্কতার উপদেশ কার্যত উপেক্ষা করে এই একটি ছবি দেখায় মানুষের ভিড় করার কারণ খুঁজে দেখছেন সমাজ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি জাপানের মনস্তত্ত্ববিদরা। তাঁদের অনেকের মতে, কমিকস বইয়ের জনপ্রিয়তা এ ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। এ ছাড়া পিশাচ বধকে করোনাভাইরাস বাগে আনার রূপক গল্প হিসেবেও অনেকে ভেবে নিচ্ছেন। ফলে করোনার দুর্দিনে এই কার্টুন ছবি একধরনের আশার বাণী জাপানের মানুষকে দেখাচ্ছে।

ছবি ও কমিকসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে আবার সংকটকবলিত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনাশিল্পকে সাময়িকভাবে হলেও উজ্জীবিত করে তুলছে। কয়েক মাস ধরে অর্থনীতির ক্রমাগত পশ্চাৎ–মুখী যাত্রায় হতাশায় ভুগতে থাকা জাপানের বাণিজ্যিক জগতের জন্য এটা নিয়ে এসেছে আলোর ছোঁয়া।

আপনার মন্তব্য লিখুন