কক্সবাজার করোনার হটস্পটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা

images.jpg

দিসিএম ডেস্ক প্রতিবেদক ॥
ছুটির দিনে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রূপ নিয়েছে জনারণ্যে, মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। জেলা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটি জানিয়েছে, হোটেল, মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আশঙ্কাজনক হারে করোনা সংক্রমিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে শিগগিরই এ জেলা করোনার হটস্পটে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) সকাল থেকে সৈকতে ঢল নামে পর্যটকদের। হোটেল-মোটেল মালিকরা জানান, সাড়ে চারশ’ হোটেলের মধ্যে নব্বই ভাগেরও বেশি কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে।
সেখানে অবস্থান করছেন অন্তত দেড় লাখ পর্যটক। তবে, সৈকতে স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশনা দেয়া হলেও তা মানছেন না কেউই। এ নিয়ে প্রচারণা চালানোর কথা থাকলেও ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের কোনও তৎপরতাও দেখা যায়নি।
এদিকে, সেন্টমার্টিন রুটে শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে জাহাজ চলাচল। সকালে দেড় হাজার যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিন গেছে দু’টি জাহাজ।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘ ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে পর্যটকশূন্য ছিল কক্সবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। চলতি বছরের ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ হওয়ার প্রায় ৫ মাস পর পরীক্ষামূলকভাবে খুলে দেয়া হয় গত ১৭ আগস্ট। স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে সীমিত আকারে পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখন টইটম্বুর। কিন্তু সরকারের সেই নির্দেশনা সেখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং অন্যান্য ছুটি থাকায় ব্যাপক পর্যটক সমাগম হয়েছে বালিয়াড়ির সৈকতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই সৈকত তীরের হোটেল-মোটেল-কটেজ ও গেস্ট হাউজগুলোর সিট বুকিং শেষ হয়ে গেছে। শুক্রবার ভোর থেকেই সৈকতে ভীড় জমিয়েছেন অসংখ্য পর্যটক।
তাদের সিংহভাগই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না বলে অভিযোগের সুরে জানিয়েছেন সৈকতে দায়িত্বরত লাইফগার্ড
কর্মীরা।
তবে, পর্যটকদের সেবা দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। আর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৭ আগস্ট থেকে প্রতিদিনই ভ্রমণ পিপাসুরা কক্সবাজার আসছেন। সরকারি ছুটির দিন ও বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বুকিংও হয়েছে হোটেল-মোটেলগুলোতে। শুক্র-শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো উপলক্ষে দেয়া হচ্ছে আগাম বুকিং।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন পর্যটকরা।
সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি দরিয়ানগর, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানীর পাথুরে সৈকত, রামু বৌদ্ধ বিহার, মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঢুঁ মারছেন।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি উপলক্ষে প্রায় লাখখানেক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। শতভাগ বুকিংয়ে জমজমাট ব্যবসা করছে তারকা হোটেলগুলো।
কক্সবাজার বিচ ম্যানেজসেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, আগত পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে সর্তক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ।
সাপ্তাহিক ছুটিতে পর্যটক সমাগম বাড়ে দেখে মোতায়েন রাখা হয় অতিরিক্ত পুলিশও। পর্যটক হয়রানি রোধে পর্যটন স্পটগুলোকে সিসিটিভি ক্যামরার আওতায় আনা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত সাধারণ চিকিৎসা ও খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে সমুদ্র সৈকতে। গোসলের সময় পর্যটকদের বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সর্তক অবস্থায় রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা পর্যটক রবিউল হাসান জানান, করোনা একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাড়ির সবাই আতংক নিয়ে কাটিয়েছি দীর্ঘ ৮ মাস। এখন আবার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরুর শংকার কথা বলা হচ্ছে। তাই মানসিক প্রশান্তির আশায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে সৈকতের সান্নিধ্য নিতে এসেছি।
সী-সেইফ লাইফগার্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, দুর্গাপূজার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই এখানে পর্যটকদের ভীড় বাড়ছে। শুক্র ও শনিবার সংখ্যাটা হয় কয়েক গুণ। করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হলেও বালিয়াড়িতে আসা পর্যটকদের অধিকাংশই মাস্ক পরেন না। জেলা প্রশাসনের
ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় অব্যহত রাখলেও পর্যটকরা সচেতন হচ্ছেন না।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ ইসলাম জানান, পর্যটক হয়রানি বন্ধে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য তালিকা টাঙ্গানোর নির্দেশনা আগেই দেয়াছিল। সমুদ্র সৈকতের লাবনী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ ১১টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র। পাশাপাশি দেয়া হয়েছে একটি হটলাইন নম্বর (০১৭৩৩৩৭৩১২৭)। যে কোনো অভিযোগ এখানে করতে পারবে পর্যটকরা।
তিনি আরও বলেন, করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সর্বদা সচেতনতা মূলক মাইকিং ও প্রয়োজনে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় সর্তকাবস্থায় রয়েছে পুলিশ। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত হয়রানির শিকার না হন, পোষাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে এবং পর্যটক বেশে পুলিশের পুরুষ সদস্যের পাশাপাশি নারী সদস্যরাও সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকত এলাকায় পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ রেসকিউ টিম, ইভটিজিং কন্ট্রোল টিম, ড্রিংকিং জোন, দ্রুত চিকিৎসাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। সৈকতে বিচ বাইক নিয়ে টহল অব্যাহত রেখেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। রয়েছে ৩টি বেসরকারি লাইফ গার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়াসহ পুরো সৈকতে পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, পর্যটন সম্ভাবনাময় শিল্প। করোনার প্রথম ওয়েভের পর দীর্ঘ ৫ মাসের অধিক কক্সবাজারে সমস্ত কিছু বন্ধ ছিল। অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা চিন্তা মাথায় রেখে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে হোটেল-রেস্ট্যুরেন্টসহ পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘পরীক্ষামূলক খুলে দেয়া’ হয়। সামনে পর্যটন মৌসুম আসছে। আবার করোনার দ্বিতীয় ওয়েভের শঙ্কার কথাও ঘোষণা এসেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা রোধের পাশাপাশি পর্যটনটাও এগিয়ে নিতে হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন