এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কাসেমের নির্দেশে পাহাড় কাটতে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যু

IMG_20201213_144739.jpg

কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৫ শতাধিক পাহাড় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাহাড় কাটার সময় গত ৪ বছরে মাটিচাপায় অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
এবার পাহাড় কাটতে গিয়ে সেই মিছিলে সামিল হলেন অসহায় দিনমজুর রহমত উল্লাহ (৩২)।
কক্সবাজারে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কাসেমের নির্দেশে গভীর রাতে পাহাড় কাটতে গিয়ে পাহাড় ধসে মাটিচাপায় তার মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (১২ ডিসেম্বর) ভোররাত ৩ টার দিকে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলের তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ায় এ ঘটনা ঘটেছে।নিহত শ্রমিক রাহমত উল্লাহ (৩২)খুরুশকুল তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ার আলতাজের ছেলে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন। তিনি জানান,গভীর রাতে প্রতিদিনের মতো শনিবারও ইউনিয়নের তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ার বেলালের পয়েন্টে পাহাড় কাটার সময় পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে ওই শ্রমিক নিহত হয়েছে।
চিহ্নিত পাহাড় খেকো জাহাঙ্গীর কাসেম ও মনিউল হকের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের হয়ে পাহাড় কাটতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীর কাসেমের মালিকানাধীন ডাম্পারে দীর্ঘদিন কাজ করছে বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার।পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করার পর এখন অভিযুক্তরা রাতে আঁধারে একের পর এক পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।
অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কাসেমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আপনার সাথে যোগাযোগ করতে একজনকে বলেছি বলে ফোনের লাইন বিছিন্ন করে দেন। তার একটু পরে আরেক অভিযুক্ত মনিউল হক প্রতিবেদককের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন।
মনিউল হক বলেন,ডাম্পার নিয়ে গত শুক্রবার থেকে শ্রমিকরা কোথায় গিয়েছিল জানি না। এদের মধ্যে শনিবার একজনের লাশ পেয়েছি।বাকি দুইজনের ফোন বন্ধ পাচ্ছি। এসময় প্রতিবেদকের সহযোগীতা চান জানিয়ে বিকাশ নাম্বার দিতে বলেন।কয়েকজন সাংবাদিক তার সাথে যোগাযোগ করেছিল তাদেরকেও টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, মাটিচাপায় শ্রমিক নিহতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে মোটা অংকের প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোকে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন জাহাঙ্গীর কাসেম নেতৃত্বাধীন পাহাড় খেকো সিন্ডিকেট। নিহতের পরিবারকেও দেয়া হয়েছে মোটা অংকের প্রস্তাব। যদিও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ,সদরের খুরুশকুলের বেশ কয়েকটি চক্র প্রতিনিয়ত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে।এসব চক্র নিয়মিত পাহাড় কাটলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয় না স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। ফলে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিনের মতো শনিবারও ইউনিয়নের তেতৈয়া দক্ষিণ পাড়ার বেলালের পয়েন্টে পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপা পড়ে ওই শ্রমিক নিহত হয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে জাঙ্গীর কাসেম পাহাড় কাটার সাথে জড়িত।তার নেতৃত্বে কমপক্ষে ৩০টির মত পাহাড় কাটা হয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা
বনবিভাগ ও স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নে পাহাড় কাটার সাথে জড়িতরা হলেন, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র জামায়াত নেতা সরওয়ার কামাল, তার ভাই জয়নাল আবেদীন, এবি পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর কাশেম, মনিউল হক, খুরুশকুল কুলিয়াপাড়া এলাকার বিএনপি নেতার ছেলে জিয়াবুল হক, সাবেক ইউপি সদস্য মৃত আব্দু শুক্কুরের ছেলে নবাব মিয়া ও তার ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক মো: রফিক।
এ ছাড়াও সদ্য র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ আটক হওয়া বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন, চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী কায়সার আলম ও তার ভাই মো: মামুন, জানাপাড়া এলাকার গিয়াস উদ্দিন, পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার শাহিন প্রকাশ বর্মাইয়া শাহিন, কুলিয়াপাড়া এলাকার আজিম বহদ্দার, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকার এবাদুল্লাহ, হামজার ডেইল এলাকার মো: রুবেল, মো: রফিক, পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার আব্দু শুক্কুর, একই এলাকার শফি প্রকাশ বর্মাইয়া শফি, সাহাব উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটার সাথে জড়িত।
সদরের পিএমখালী ও খুরুশকুলের ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক পাহাড় তারা সাবাড় করেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিশেষ টহল টিমের ইনচার্জ এ কে এম আতা এলাহী জানান, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর কাসেম ও মনিউল হকের বিরুদ্ধে আগেও ওই এলাকায় পাহাড় কাটার দায়ে একাধিক মামলা করেছে বনবিভাগ। তাদের পাহাড় কাটতে গিয়ে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে বনবিভাগ। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ওই এলাকায় কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি সংযুক্তা দাশ গুপ্তা অভিযুক্ত পাহাড় খেকোদের সাথে কোন ধরনের আঁতাত নেই দাবি করে বলেন, পাহাড় কাটতে শ্রমিক নিহতের বিষয়টি আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি যদি এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে থাকে তবে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পাশাপাশি ওই এলাকায় পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে আগামী দুই একদিনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ হবে। তাদের সাথে আঁতাতের প্রশ্ন আসে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় নিহত শ্রমিক রহমত উল্লাহকে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে নিহতের ঘটনায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোন থানায় কোন মামলা হয়নি।
কক্সবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত শ্রমিক নিহতের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কেউ মামলা করতে থানায় আসেনি বলে জানিয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন