ঈদগাঁহ’তে গ্যাস ক্রসফিলিং অগ্নিকাণ্ড : রাতের আঁধারে নীরবেই ২ শ্রমিকের লাশ দাফন

IMG_20201213_214815.jpg

কাফি আনোয়ার :

ঈদগাহ’তে অবৈধ গ্যাস ক্রসফিলিং ডিপোতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও গ্যাসসিলিণ্ডার বিষ্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা ২ শ্রমিকের লাশ রাঁতের আঁধারে অনেকটা নীরবেই দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

অগ্নিদগ্ধ নজরুলকে তার গ্রামের বাড়ি জালালাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ লরাবাগ জামে মসজিদ কবরস্থানে গত ১০ ডিসেম্বর রাত ৯টায় এবং অপর শ্রমিক জামাল উদ্দিনকে তার গ্রাম রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের পাহাড়তলী (৪নং ওয়ার্ড) ১১ ডিসেম্বর রাত ৮টায় অনেকটা গোপনে দাফন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ৯ ডিসেম্বর একইদিন কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে অগ্নিদগ্ধ ২ শ্রমিকের মৃত্যু, ১ দিন আগে পরে রাতের আঁধারে লাশ আনা এবং সেই রাতেই নীরবে লাশ দাফন করা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। এই নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা ও সন্দেহ। অনেকে প্রকাশ করছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া।
নিহত ২ শ্রমিকের পরিবার যেমন এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু মেনে নিতে পারছেনা তেমনি খুঁজে পাচ্ছেনা এই অকাল মৃত্যুর কোন কারণ। ঘটনার কারণ তদন্তে লোকমুখে শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য।
কেউ কেউ এই মৃত্যুকে কন্ট্রাক্ট কিলিং বলতেও দ্বিধা করছেন না, আবার কারো কারো মতে অস্বাভাবিক মৃত্যু। কেউ কেউ মনে করছেন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আবার রহস্যজনকভাবে মুখ বন্ধ করে রেখেছে অনেকে।

ঘটনার দিন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিস এণ্ড সিভিল ডিফেন্সের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

রামু থেকে আসা ফায়ার সার্ভিস এণ্ড সিভিল ডিফেন্সের একটি ইউনিট আগুন নিভাতে এবং স্থানীয় জনতা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মালামাল সরানোর কাজে যথেষ্ট তৎপর ছিল। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ঘটনা তদন্তে প্রকৃত সত্য আড়াল করতে প্রভাবিত হয়েছে বলে অভি্যোগ উঠছে। এছাড়া স্থানীয় ঈদগাহ পুলিশ তদন্তকেন্দ্রও কোন না কোনভাবে প্রভাবিত হয়ে ঘটনাটিকে নিছক দূর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিচ্ছে বলে লোকমুখে শোনা যাচ্ছে। এবিষয়ে
স্থানীয় ঈদগাহ পুলিশতদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুল হালিম দৈনিক বাঁকখালিকে বলেন, অভিযোগ কিংবা লাশের ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্ট আসলে মামলা বা অপমৃত্য মামলা হতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি সুষ্ঠুতদন্ত ছাড়াই মালিকপক্ষকে বেনিফিট অব ডাবট দিতে রাজনৈতিক কিংবা অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি নেপথ্যশক্তি জোরালো ভুমিকা রেখেছে বলে সচেতনমহলের বদ্ধমূল ধারণা।

মালিকপক্ষ আবু ছৈয়দ গংয়ের দীর্ঘদিন বিভিন্নস্থানে চলমান অবৈধ গ্যাস ক্রসফিলিংয়ের( বড় সিলিণ্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডার ওজন কারচুপির মাধ্যমে গ্যাস স্থানান্তর) ধারাবাহিকতায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে শনাক্ত করে দায় এড়াতে চায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর, এমন অভিযোগও মানুষের মুখে মুখে বলতে শোনা যাচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে কিভাবে সংঘটিত হলো সেই তদন্তের উপরই নির্ভর করছে নিহত শ্রমিকদের ন্যায় বিচারপ্রাপ্তি কিংবা ক্ষতিপূরণের দাবি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, গ্যাস ক্রসফিলিংজনিত সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের তথ্য ফাঁসের ভয়ে অথবা মালিকপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির মোটা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনী জটিলতা কাটাতে বা শৈথিল্য পাওয়ার আশায় কোন না কোন পরামর্শকের ইঙ্গিতে পরিকল্পিতভাবে আগুনে পোড়া ২শ্রমিককে কন্টাক্ট কিংলিংয়ের মাধ্যমে ঘটনার সাক্ষী, তথ্যপ্রমাণ, আলামত নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য গত ৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদগাহ ইউনিয়নের মেহেরঘোনা এলাকায় কক্সবাজার চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে আবু ছৈয়দের ( কথিত চৌধুরী আবু তৈয়বের ভাই) মালিকানাধীন এলপি গ্যাসসিলিণ্ডারের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও অর্ধশতাধিক গ্যাসসিলিণ্ডার বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই সময় গুদামে কর্মরত ৪ শ্রমিকের মধ্যে ২জন অগ্নিদগ্ধ হয়। অগ্নিদগ্ধ ২ জনই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিল। ৯ ডিসেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টা ব্যবধানে উভয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, অগ্নিদগ্ধ ২ শ্রমিকের মধ্যে নিহত জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। ফিরে আসার ১দিন পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পূণরায় ওই মেডিক্যালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া।
এর ৩দিন পর গত ৯ ডিসেম্বর একই রাতে ২ জনই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
এই ঘটনা বৃহত্তর ঈদগাঁহ’সহ পুরো জেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
বিশ্বস্তসূত্র মতে, সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের সময় গুদামের বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় নিহত নজরুল ও জামাল উদ্দীন ওই গুদামের ভেতর গ্যাস ক্রসফিলিংয়ের কাজ করছিলেন। ৩ প্রকোষ্ট বিশিষ্ট ওই গুদামের প্রবেশমুখ সংলগ্ন প্রকোষ্টে কাজ করছিলেন অপর ২শ্রমিক, সেদিন
থেকেই ওই ২শ্রমিক আত্মগোপনে চলে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা গেছে,অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পূর্বে সকাল ৭টার দিকে গুদামের প্রবেশমুখে কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে ১জন শ্রমিক( নাম জানা যায়নি,তবে তিনি ইসলামাবাদ ইউনিয়নের হিন্দুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বলে জানা গেছে) অগ্নিদগ্ধ নজরুল ও জামালের জন্য সকালের নাশতা আনতে স্থানীয় মেহেরঘোনা কলেজগেটস্থ চায়ের দোকান আসে। নাশতা নেয়ার সময়ই প্রথম একটি গ্যাস সিলিণ্ডার বিষ্ফোরণের বিকট শব্দে ওই এলাকা কেঁপে উঠে এবং ভয়াবহ আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে গুদামের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
নিমিষেই ওই আগুনে হতভাগ্য জামাল ও নজরুলের দেহের ৮০ভাগ পূড়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ ২জনকে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ঘটনার ৬দিন পর গত ৯ ডিসেম্বর রাতে অগ্নিদগ্ধ ২জনই মৃত্যুবরণ করে। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটনের পাঁচলাইশ থানা সাব ইন্সেপেক্টর আশরাফুল কবির লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করার পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।
ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ৮ দিন পার হয়ে গেলেও কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস এণ্ড সিভিল ডিফেন্স, সদর উপজেলা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি।
একটি বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালীচক্র অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠে।
ওই নেপথ্যচক্রের কলকাঠিতে নিহত শ্রমিকদের পরিবার কোন প্রকার মামলা মোকাদ্দমা এবং অন্যকোন দাবিদাওয়া ছাড়া ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে আপোষ মীমাংসা করে ফেলেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই বিষয়ে নিহত নজরুলের চাচা জয়নাল আবেদীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি।
গ্যাস সিলিণ্ডারের মত দাহ্য ও বিষ্ফোরক দ্রব্যের মজুত, সরবরাহ, বিতরণ ও পরিবহণে সরকার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও মানা হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে সরকাররের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি,পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ কিংবা মনিটরিং না থাকায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে গ্যাসসিলিণ্ডার ব্যবসায়ীগণ। সেই সুযোগে অতিমুনাফার লোভে জড়িয়ে পড়ছে গ্যাস ক্রসফিলিংয়ের মত ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ বাণিজ্যে। যথাযথ অনুমোদন ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না রেখে শ্রমিকদের নিয়োজিত করা হচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ ওই কাজে। এই দায় কার?

আবু ছৈয়দ গংয়ের মালিকানাধীন মেসার্স মক্কা গ্যাস এজেন্ট যথাযথ লাইসেন্স বা সরকারের অনুমোদন বা নীতিমালা মানা হলে এই অবৈধ গ্যাস ক্রসফিলিংয়ের দায়িত্ব কার?
সেই গ্যাসের গুদামের অনুমোদন থাকলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি কেন করা হয়নি?
পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নীতিমালা অনুসরণ করা হলে নিহত শ্রমিকের জীবনের মুল্য কি দফারফা আর ৩ লক্ষ টাকা? নিহত শ্রমিকের মৃত্যুর দায় কি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জালানী কর্তৃপক্ষ , ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের উপর বর্তায় না?
এই সকল প্রশ্ন সাধারণমানুষের মুখে মুখে। কিন্তু এর জবাব জানা নেই কারো। শ্রমিকের দাসখতে এই দেশ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বলে সবাই আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছি আর শ্রেণীসংগ্রামে মরণপণ যুদ্ধরত সেই শ্রমিকরাই প্রতিনিয়ত নিগৃহীত,লাঞ্চিত, নিপীড়িত, অধিকারবঞ্চিত। এই রাষ্ট্রের কাছে, অর্থপ্রভাবশালী এই সমাজের তথাকথিত পেটিবুর্জোয়াদের কাছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন