ইয়াবা কারবারিদের চোখ জনশক্তি রপ্তানির দেশে

22688886_308967629583035_5024591602668740410_n-10.jpg

হাসান আল জাভেদ

বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার সৌদি আরব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের বৈশ্বিক করোনা মহামারীতেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, তার এক-চতুর্থাংশই এসেছে ওই দেশটি থেকে। সৌদি আরবসহ জনশক্তি রপ্তানির দেশগুলোয় প্রাণনাশা ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারে সক্রিয় আন্তর্জাতিক মাদক গডফাদার চক্র। তারা ইয়াবা পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে কুরিয়ার সার্ভিস ও কিছু প্রবাসী শ্রমিককে। এতে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ইয়াবার মূল উপাদানের ‘অ্যামফিটামিন’ পাচারের সময় এ বছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৪টি চালান ধরা পড়েছে। সৌদি আরবে পাচারের চেষ্টাকালে গত ১০ আগস্ট তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের গুলশান লিংক রোডের ‘ডিএইচএল’ কুরিয়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস থেকে ছয়টি ট্রাভেল ব্যাগভর্তি অ্যামফিটামিনযুক্ত ৩ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের একটি দল। ওই ঘটনায় আবু দারদা, মোস্তাফিজুর রহমান শামীম ও মোজাম্মেল নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চমাত্রার অ্যামফিটামিন মেশানো ট্যাবলেটগুলো ভেঙে পুনরায় লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরির সুযোগ ছিল। তারা বলছেন, ময়মনসিংহের নান্দাইলের আক্তারুজ্জামান সিজন ভূঁইয়া নামে এক প্রেরকের ঠিকানা ব্যবহার করে কিশোরগঞ্জ শহরের স্টেশন রোডে থাকা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস বুথে বুকিংয়ের মাধ্যমে ওই চালানটি সৌদি আরবের রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। এতে রিয়াদে বসবাসকারী বাংলাদেশি কথিত মো. আবু শহীদকে প্রাপক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক কুরিয়ারে পার্সেল পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রেরক বা তার পক্ষে উপস্থিত ব্যক্তি বা বাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন এবং কপি প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট ভিডিও কল ও মেসেজিং অ্যাপস ‘ইমু’র মাধ্যমে সৌদি আরবে বসবাসকারী মাদককারবারির কাছ থেকে আক্তারুজ্জামান সিজন ভূঁইয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করেন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টেশন রোড শাখার বুথ ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান শামীম। এর পর ওই চালানটি ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিস হয়ে রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল- জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মোস্তাফিজুর রহমান শামীম অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ইয়াবার চালানটি পাচারে জড়িত। এ ছাড়া প্রেরক আক্তারুজ্জামান সিজন ভূঁইয়ার নাম-ঠিকানাও ভুয়া। চালানটির বাহক ছিলেন কিশোরগঞ্জ সদর থানা মোকছেদপুর গ্রামের আবু দারদা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম এর পর ট্রেনযোগে চালানটি কিশোরগঞ্জে এসেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, আসামিদের স্বীকারোক্তি ও তদন্তে উঠে এসেছে এই চোরাকারবারি চক্রের অন্যতম সদস্য নয়ন নামের ব্যক্তি। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, এ চক্রটি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য। কিশোরগঞ্জকেন্দ্রিক চক্রটি ইয়াবা চোরাচালান এবং সৌদিতে স্থানীয় বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে সরবরাহ করছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে দুভাবে বিদেশে ইয়াবা ট্যাবলেট রপ্তানি হচ্ছে। প্রথমত, এক্সপ্রেস বা আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে লাগেজ ও পার্সেলে করে। দ্বিতীয়ত, বিদেশগামী যাত্রীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। তবে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো যতগুলো চালান বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে ধরা পড়েছে, তার অধিকাংশই বহুজাতিক কুরিয়ার ও মেইল সার্ভিস কোম্পানি ‘ডিএইচএল ও ফেডেক্স’-এর পার্সেল থেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকদ্রব্যসহ অন্য চোরাচালান শনাক্তে কার্গো হাউসে এই দুই কুরিয়ার সার্ভিস নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ স্ক্যানার স্থাপন করেছে। সে কারণে এখানে মাদকের চালান ধরা পড়াটা ইতিবাচক। তবে ৬৭টি আন্তর্জাতিক এক্সপ্রেস বা কুরিয়ার সার্ভিসের স্ক্যানার না থাকায় সেসব প্রতিষ্ঠানের পার্সেলের আড়ালে মাদক পাচারের বড় ঝুঁকি রয়েছে।

বাহক হিসেবে প্রবাসী যাত্রীদের ব্যক্তিগত লাগেজ/ব্যাগেজে করে ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারের চেষ্টাকালে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে গত এক বছরে লক্ষাধিক ইয়াবা ট্যাবলেট ধরা পড়েছে। কাতারের দোহা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইয়াবাসহ গত পাঁচ বছরে আটক হয়েছেন পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি। সৌদি আরবে ইয়াবা পাচারের চেষ্টাকালে রিয়াদ বিমানবন্দরসহ দেশটির ভেতরে মাদক গডফাদার চক্রেও বাংলাদেশিদের নাম রয়েছে।

সৌদি আরবভিত্তিক গণমাধ্যম ‘আরব নিউজ’-এর গত ২১ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি দেশটিতে ১৯ মিলিয়ন অ্যামফিটামিন ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে। এর আগে গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দেশটিতে ১ কোটি ৯২ লাখ অ্যামফিটামিন ট্যাবলেট জব্দ হয়। সৌদি আরবের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে ১ মে প্রকাশিত ‘আল অ্যারাবিয়া ডটনেটের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ কোটি ৯২ লাখ অ্যামফিটামিন ট্যাবলেটের চালান প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ হয়ে সৌদিতে প্রবেশ করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশি। যারা বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে আসা চালানটি ৯ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় বন্দরগুলো হয়ে ‘কিং আবদুল্লাহ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ পৌঁছায়।

মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের অপারেশন ও গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি সৌদি আরবে ইয়াবার বড় বড় চোরাচালান জব্দের ঘটনায় দেশটি উদ্বেগে রয়েছে। সৌদি সরকার এখন মাদকের বিরুদ্ধে ক্রাকডাউন চালাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশিরা সৌদির চোরাচালানে যুক্ত থাকা বা বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইয়াবার চোরাচালান গেলে তা দেশের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আমাদের সময়কে বলেন, সৌদি আরব বা যে কোনো দেশে একটি শ্রমবাজার একদিনে তৈরি হয়নি, যা মাদক পাচারের কারণে নষ্ট হবে। তবে সব দেশই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে। এ জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে মাদক পাচার হলে তাতে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। এতে ধীরগতিতে হলেও শ্রমবাজারে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত সুনাম ইয়াবা বহনের মাধ্যমে নষ্ট করতে চাইবে না। গুটিকয়েক মানুষ ইয়াবা বাহক বা ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে। এ জন্য সরকারি যেসব সংস্থা বিমানবন্দরে কাজ করছে, তাদের কৌশল বদলাতে হবে, প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, কুরিয়ার সার্ভিস ও এক্সপোর্ট কার্গো ব্যবহার করে মাদক পাচার রোধে ১৩ ডিসেম্বর কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমরা কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিকে বলেছি তারা যাতে স্ক্যানার বসায়। স্ক্যানার ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা ডগ স্কোয়াড কাজে লাগাতে পারে। কাস্টমস এলাকায় আধুনিক মাদক শনাক্তকারী যন্ত্র স্থাপনের বিষয়ে কর্মশালায় সুপারিশ এসেছে। এগুলো কার্যকর হলে বিমানবন্দর হয়ে মাদক পাচার বন্ধ হবে।

নিয়ন্ত্রণহীন কুরিয়ার সার্ভিস : আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস বা এক্সপ্রেস কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ‘মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ’। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৩ সালের বিধিমালা অনুযায়ী ৮৫টি অভ্যন্তরীণ কুরিয়ার সার্ভিস এবং ৭৫টি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার বা এক্সপ্রেস সার্ভিস ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে। তিন বছর পরপর লাইসেন্স নবায়ন করার কথা থাকলেও ৫০টি অভ্যন্তরীণ কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি নবায়ন ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ অসংখ্য কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। এ ক্ষেত্রে মেইলিং অপারেটর কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মনিটরিং ও জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় অবৈধ অভ্যন্তরীণ কুরিয়ার সার্ভিসগুলো অভ্যন্তরীণভাবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মাদক পাচারে সহায়তা করছে। আবার বিদেশে মাদক পাচারেও এরা বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগসাজশ করছে।

এ ব্যাপারে কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মাদক চোরাচালানে জড়িত বা অনিবন্ধিত কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদ্য বদলিকৃত সংস্থাটির চেয়ারম্যান জেহসান ইসলাম বলেন, আমি যেহেতু এখান থেকে বদলি হয়েছি তাই এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।

তবে কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিষ্ঠিত কোনো কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি চাইবে না চোরাচালানের কারণে তাদের ব্যবসার সুনাম নষ্ট হোক। আমরাও চাই ল্যান্ড পোর্ট বা বিমানবন্দরে কার্গো হাউসে অত্যাধুনিক স্ক্যানার বসানো হোক। কিন্তু দু-একটি মাল্টিন্যাশনাল কুরিয়ার সার্ভিস ছাড়া অন্যদের পক্ষে এত ব্যয়বহুল স্ক্যানার বসানো দুরূহ।

কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি মালিকদের সংগঠনের প্রধান আরও বলেন, ইতোমধ্যে আমরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ কুরিয়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রক সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব দিয়েছি যে সরকারিভাবে স্ক্যানার বসানো হোক। সেখানে যেন ন্যূনতম ব্যয়ে আমাদের স্ক্যান করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১০-১২টি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি নিজস্ব উদ্যোগে স্ক্যানার আমদানি করতে চাচ্ছে, তাদের ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করে দেওয়া হোক।

আপনার মন্তব্য লিখুন