‘আম্মা’র বিদায়

IMG_20201031_014202.jpg
॥ আসিফ নূর ॥
গত পরশু ২৮ অক্টোবর ২০২০ তারিখ রাত আনুমানিক আড়াইটার সময় কক্সবাজারের স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কক্সবাজারের প্রবাদপ্রতিম শিক্ষাব্যক্তিত্ব মরহুম অধ্যক্ষ স.আ.ম. শামসুল হুদা চৌধুরীর সুযোগ্যা সহধর্মিণী সর্বজন শ্রদ্ধেয়া জনাবা জাহানারা বেগম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তাঁর মৃত্যুতে কক্সবাজারের বিভিন্ন প্রজন্মের অসংখ্য মানুষের মাঝে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। সেই শোকমিছিলের একজন হিসেবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমি কিছু ব্যথিত বাক্য উৎসর্গ করতে চাই। সেজন্যই সংক্ষিপ্ত এই লেখা।
০২.
পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুরতম ডাক হলো ‘মা’। প্রতিটি নারীই সারাজীবন এই ডাক শুনতে চান। সন্তানরাও এই ডাকে মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে তৃপ্ত হন। মরহুমা জাহানারা বেগম ছিলেন এমনই বিরল এক সৌভাগ্যবতী নারী, যাঁকে শুধু তাঁর রক্তের সন্তানসন্ততিরাই নয়, নানান প্রজন্মের অসংখ্য নারী-পুরুষই ‘আম্মা’ বলে ডাকতো। তাঁর নিজের সন্তানসন্ততি ১২ জন। সবার বন্ধুবান্ধবরাই তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় ‘আম্মা’ বলে ডাকতো। তদুপরি অধ্যক্ষ চৌধুরী এবং জাহানারা বেগম দু’জনই ছিলেন উচ্চবংশীয়। তাই তাঁদের আত্মীয়স্বজনও অনেক। আত্মীয়স্বজনদের একটি বিরাট অংশও তাঁকে ‘আম্মা’ নামে ডাকতো। এর প্রধান কারণ তাঁর বিশাল স্নেহের পরিধি। তিনি সবাইকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহের আশ্রয় দিতেন। এই অপার স্নেহশীলতার কারণেই তাঁকে শ্রদ্ধাভরে ‘আম্মা’ ডেকে তৃপ্ত হবার মানুষ অনেক।
  • বর্তমানে আমরা খুব নিষ্ঠুর এবং স্বার্থপর একটি সময় পাড়ি দিচ্ছি। নিজের মাকেই অনেক অকৃতজ্ঞ সন্তান ‘মা’ বলে ডাকে না। এমন কদর্যকালে কোনো নারীকে নিজের সন্তানসন্ততিদের সাথে অন্যান্য অনেকেই ‘আম্মা’ বলে ডাকা সত্যিই বিরাট আশ্চর্যের। এমন মহান মা পৃথিবীতে খুব বেশি আসেনি। আমাদের সবার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় এই ‘আম্মা’কে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই।
    ০৩.
    মরহুম অধ্যক্ষ স.আ.ম. শামসুল হুদা চৌধুরী কক্সবাজারে সৃষ্টি করেছেন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কক্সবাজার সরকারি কলেজ, কক্সবাজার আইন কলেজ, সৈকত বালিকা বিদ্যালয়, পৌর প্রিপারেটরি হাইস্কুল সব তাঁরই সৃষ্টি। অধ্যক্ষ চৌধুরীর এইসব মহান সৃষ্টিশীলতায় তাঁর পত্নী জাহানারা বেগমের পরিপূর্ণ সমর্থন ছিল, আমরা এর প্রমাণ পাই আমার সম্পাদনায় ২০১৪ সালে প্রকাশিত অধ্যক্ষ স.আ.ম. শামসুল হুদা চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’-এ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ইদ্রিস আহমদের স্মৃতিচারণে। তখন ১৯৬২ সাল। তৎকালীন কক্সবাজার মহকুমায় কোনো কলেজ ছিল না। তখনকার তুখোড় ছাত্রনেতা ইদ্রিস আহমদ ও মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী কক্সবাজারে কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অধ্যক্ষ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে তাঁর বদরমোকামের বাসায় যান। ইদ্রিস আহমদ লিখেছেন_ ‘আমরা উনাকে সব খুলে বললাম। সব শুনে তিনি খুব খুশি হলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে সব স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আসতে বললেন। তাঁর স্ত্রী একটি কাপড় প্যাঁচিয়ে সব স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে এলে তিনি সেগুলো দেখিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ব্যয়ভার মেটানোর জন্য এগুলো উৎসর্গ করা হবে।’ এই ঘটনা থেকে এটাই স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, অধ্যক্ষ চৌধুরীর মহান সৃষ্টিশীলতায় তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগমের নিরঙ্কুশ সমর্থন ছিল। তাই অধ্যক্ষ চৌধুরী শিক্ষাবিস্তারের পবিত্র ব্রতে নিজেকে শান্তিপূর্ণভাবে অহর্নিশ নিয়োজিত রাখতে পেরেছিলেন। কক্সবাজারে শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসে অধ্যক্ষ চৌধুরী যদি মহানায়ক হন, তাহলে একথাও স্বীকার করতে হবে যে, তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগম ছিলেন সেই যুদ্ধের গোপন মহানায়িকা। মরহুমা জাহানারা বেগমকে আমরা যেন সেভাবেই মূল্যায়ন করি। আসুন, আমরা সবাই মিলে পরম করুণাময় খোদা তা’লার দরবারে প্রার্থনা করি‘হে দয়াময়, আমাদের মহান ‘আম্মা’কে তুমি জান্নাতের সুশীতল ছায়ায় জায়গা করে দাও। আর আমরা সবাই যেন তাঁকে হারানোর বেদনার ভার বইতে পারি। আমিন।’
    লেখক : কবি, গীতিকার।
আপনার মন্তব্য লিখুন