সংবাদ শিরোনামঃ
কক্সবাজার বাসির অভিযোগ ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ওরিয়ন পাচ্ছে ৬০ কোটি টাকায়যে কারণে ভারতে পাচার হচ্ছে দুই টাকার নোটরোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা শুনলেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং হি লিমহেশখালীতে মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছেলেরও মৃত্যুনিজের স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করল মহেশখালীর আহমদ আলীচকরিয়ায় তফসির মাহফিলের বক্তাকে বেদড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখমবাকঁখালী থেকে উদ্ধার লাশের পরিচয় মিলেছেআলীকদমে ১৩ আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক ৩টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত ২টি মহিলা আসনের তপশীল গোপন করার অভিযোহোয়াইক্যং ৯ হাজার ৯৬৮ পিস ইয়াবাসহ পাচারকারী আটকশ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বিশাল জয় বাংলাদেশেরটেকনাফে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ লম্বাবিলের জাফর গ্রেপ্তারমিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগে এমপি গ্রেপ্তাররাখাইনে ফিরতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় রোহিঙ্গারাতামিম-সাকিব-মুশফিকের ব্যাটে বাংলাদেশ ৩২০ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিবাড়িতে টাকার বিছানা, গুনতে গিয়ে রাত শেষ!ভারতের পরমাণু হামলাক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা২৬, ২৭ জানুয়ারী কক্সবাজারে ২দিনব্যাপী শানে রেসালত সম্মেলনঅতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেলেন রায়হান কাজেমী

তালেবানের মৃত্যুর হুমকিও যখন হেরে যায়

download-14.jpg

‘আমি মরতে চাইনি।’
বিশ্বব্যাপী মেয়েদের ফুটবল নিয়ে মাতামাতি চললেও তাঁদের উঠে আসার পথটা কিন্তু সংগ্রামের। তাই বলে এই একুশ শতকেও ফুটবল খেলার জন্য একটি মেয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হুমকি পাবেন, অনুশীলনের সময় পাড়াপড়শি থেকে স্থানীয়রা তাঁকে বলবে ‘বারাঙ্গনা’; এমনকি প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে দেশ পর্যন্ত ছাড়তে হবে—এসব কি অলীক কল্পনা?

খালিদা পোপাল বলছেন, না, তাঁর জীবনে এসবই বাস্তবতা। আফগানিস্তান নারী দলের সাবেক অধিনায়ক এখন আর খেলেন না। যে ফুটবলকে ভালোবেসে তালেবান জঙ্গিদের মৃত্যুপরোয়ানা গলায় ঝুলিয়েছেন, সহ্য করেছেন পাড়াপড়শিদের রক্তচক্ষু আর কটাক্ষ, এমনকি দেশও ছেড়েছেন; সেই ফুটবলটাই কিনা ছেড়ে দিতে হলো চোটের কাছে পরাজিত হয়ে!

খেলা ছেড়ে এখন আফগানিস্তান নারী ফুটবলে ‘প্রোগ্রাম ডিরেক্টর’-এর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গড়েছেন ‘গার্ল পাওয়ার’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। শরণার্থীশিবির থেকে প্রতিভাবান ফুটবলারদের ভালো কোচের অধীনে গড়েপিটে বড় করাই তাদের কাজ। ‘গার্ল পাওয়ার’ ফিফা ও উয়েফার সঙ্গেও কাজ করছে। খালিদা এখন ‘গ্লোবাল আইকন’। কিন্তু এই ‘আইকন’ হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা দুঃখ, সাহস আর রোমাঞ্চের। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই গল্পই বলেছেন খালিদা।

২০১৪ সালে আফগানিস্তানে প্রথম নারী ফুটবল লিগে একটি ম্যাচের দৃশ্য। ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস২০১৪ সালে আফগানিস্তানে প্রথম নারী ফুটবল লিগে একটি ম্যাচের দৃশ্য। ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস

সময়টা ২০১১ সালের এপ্রিল মাস। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অবসান ঘটার ১০ বছর কেটে গেছে। কিন্তু সমূলে উৎপাটিত হয়নি উগ্রপন্থী সেই গোষ্ঠী। তালেবানের কাছ থেকে তখনো প্রায়ই মৃত্যুর হুমকি পেতেন খালিদা। তাঁর অপরাধ? ফুটবল খেলা। তত দিনে জাতীয় দলে খেলছেন চার বছর হয়ে গেছে। কিন্তু জাতীয় দলের খেলোয়াড় হয়েও জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। প্রতিদিনই মৃত্যু দেখা দিত খালিদাকে, ‘তালেবান নিয়মিতই মৃত্যুর হুমকি দিত। জানতাম আফগানিস্তানে থাকলে ভীষণ বিপদ হবে। একটা পথ বেছে নিতে হতো—হয় এখানে থেকে পরিণতি মেনে নেব, নয়তো দেশ ছেড়ে নিজের লক্ষ্যে কাজ করে যাব। আমি মরতে চাইনি।’ আফগানিস্তান জাতীয় দলের হয়ে ২০ ম্যাচ খেলা সাবেক এ ডিফেন্ডার এখন ডেনমার্কে আশ্রিত। বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মেয়েদের হয়ে কথা বলা এবং পাশে দাঁড়ানোই এখন তাঁর কাজ।

খালিদা নিজেও একসময় এ কাতারে ছিলেন। তাঁর মনের মধ্যে ফুটবলের বীজ বুনেছিলেন তাঁরই মা। স্কুল কিংবা নির্জন কোনো জায়গায় খেলতেন খালিদা। স্কুলের মধ্যে খেললে কোনো শব্দ করা যাবে না। তাহলেই সর্বনাশ! দেয়ালের ওপাশে টহলরত তালেবান সেনা। দেখলে কল্লা ফেলে দেবে!

খালিদা দমে যাওয়ার পাত্রী নন। মেয়েদের ফুটবল খেলার ব্যাপারে প্রতিবেশী পরিবারকে বোঝাতে শুরু করলেন সেই বয়সেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অশ্রাব্য সব কথা শুনতে হতো। কিন্তু ফুটবলে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকল। সঙ্গে কটূক্তিও। দল ভারী হওয়ায় লুকিয়ে খেলা ছেড়ে সবার সামনে মাঠে খেলতে শুরু করলেন তাঁরা। অনেকেই তাঁদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারত। স্থানীয় লোকজন ‘বারাঙ্গনা’ বল ডাকত। তাঁদের ব্যাপারে খালিদার ভাষ্য, ‘শুধু বন্দুকওয়ালা তালেবান জঙ্গিরাই আমার সমস্যা ছিল না; স্যুট-টাই-বুট পরা ‘তালেবান’ও ছিল—এসব মানুষ তালেবান মানসিকতা নিয়ে মেয়েদের বিরুদ্ধাচরণ করত।’

স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে খালিদা জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি ঘটেনি। জনসমক্ষে খেলার ঝুঁকি থাকায় খালিদা এবং তাঁর সঙ্গীরা মিলে ন্যাটোর ঘাঁটিতে অনুশীলনের অনুমতি জোগাড় করেছিলেন। ২০০৭ সালে ন্যাটোর সেই নিরাপত্তা বাহিনীর (আইএসএএফ) সঙ্গেই প্রথম ম্যাচে ৫-০ গোলের জয় পেয়েছিল আফগানিস্তান নারী দল।

জাতীয় দলে খেলার সময়েই অবস্থা চরমে পৌঁছালে খালিদা এক রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশ ছাড়তে হবে। কথাটা শুধু বাবা-মাকে জানিয়ে খালিদা বেরিয়ে পড়েছিলেন। সঙ্গে ছিল শুধু তাঁর ব্যাগ, কম্পিউটার আর জাতীয় দলের একটা ছবি। খালিদা জানতেন না কোথায় যেতে হবে কিংবা আর কখনো জন্মভূমিতে ফেরা হবে কি না!

কাবুল থেকে ভারতে লুকিয়ে ছিলেন কয়েক মাস। কোনো ভিসা না থাকায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ভারতেই জাতীয় দলের জন্য ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন খালিদা। সতীর্থরা তখন জানতে পেরেছিলেন, দেশে খালিদাকে কেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর ভারতে আর বেশি দিন থাকেননি খালিদা। পাড়ি জমালেন পাকিস্তানে। তারপর নরওয়ের এক শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে চলে যান, এরপর ডেনমার্ক।

গত বছর আফগান জাতীয় দলের অনুশীলনের একটি মুহূর্ত। ছবি: এএফপিগত বছর আফগান জাতীয় দলের অনুশীলনের একটি মুহূর্ত। ছবি: এএফপি

আফগানিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে বেড়া ভেঙে ভিনদেশের পথে বেরিয়ে পড়া একজন নারী কীভাবে একাই দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে গেলেন, সে সম্পর্কে খালিদার উক্তি, ‘আমি হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নই। যা-ই হোক না কেন, নিজেকে দুর্বল দেখতে ঘৃণা করি। দুর্বল হতে ভয় লাগে, হাল ছাড়তেও ভয় লাগে।’

কিন্তু ডেনমার্কে খালিদা এমন একটা সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন সত্যিই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্থানীয় একটি দলের হয়ে খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। খালিদা ভেবেছিলেন জীবনের মোড় ঘুরে যাচ্ছে! মোড় কিন্তু সত্যিই ঘুরেছিল। এক ম্যাচে হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে শেষ পর্যন্ত বুট জোড়াই তুলে রাখতে হলো! ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন খালিদা। সেই দিনগুলো কোনো দিন ভুলতে পারবেন না তিনি, ‘সবকিছু হারিয়ে ফেললাম। দেশ, পরিচয়, ফুটবল। ঠিকানা হলো আশ্রয়কেন্দ্র। পরিবার ছিল না। খেলতে পারতাম না। নিজেকে মনে হতো বাতাসে ঝুলে থাকা একটি পুতুল।’

হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা করতেন মনোবিদেরা। একদিন সেই হাসপাতালেই খালিদা খেয়াল করলেন, তাঁর চেয়েও বাজে অবস্থায় রয়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা বাকি মেয়েরা। খালিদা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাইলেন। তাঁদের নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন, ফুটবলে লাথি মারতে অনুপ্রেরণা দিতেন। বলের পিছু পিছু সেসব রোগী যখন ছুটত, খালিদার ভীষণ ভালো লাগত। এখান থেকেই তাঁর মনে জন্ম নিল ‘গার্ল পাওয়ার’ গড়ে তোলার স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নের চারাগাছ এখন বাস্তবে মহিরুহসম। খালিদাও পাচ্ছেন স্বীকৃতির পর স্বীকৃতি। মোনাকোর খ্যাতনামা ‘পিস অ্যান্ড স্পোর্ট’ সংস্থা তাঁকে এবার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছে। সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যেতে সাক্ষাৎকার ছেড়ে উঠে যাওয়ার আগে খালিদা জানিয়ে গেলেন তাঁর মনের কথা, ‘আমি ভীষণভাবে স্বপ্ন দেখি, একদিন আমার মতো আর কেউ থাকবে না। একজন মানুষও নয়, যে আমার মতো একা, শুধু নিজের ওপর ভরসা করে পথ চলেছে।’

Top