কেরামত আলীর সুপারমুন !

Presentation1-10.jpg

আতিকুর রহমান মানিক

সুপার মুন দর্শনে গিয়েও কেউ ঝামেলায় পড়তে পারে, এটা ভুলেও কল্পনা করেনি কেউ। কিন্তু আমাদের কেরামত আজ সেই ট্র্যাজেডিরই শিকার হল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরেই সুপারমুনের গুঞ্জন শুনছিল কেরামত আলী। পত্র-পত্রিকা-অনলাইনে এ নিয়ে যেন লেখালেখির শেষ নেই। এ রাতে নাকি চাঁদ পৃথিবীর নিকটতম দুরত্বে আসছে, তখন চাঁদের আলো ১৪ % বেশী হবে, সুপার মুন আবার দেখা যাবে ২০৩০ সালে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সুপারমুনের রেশ কয়েকদিন থাকবে বলেও শুনেছিল সে। জরুরী কিছু কাজ থাকলেও সময় করে প্রস্তুতি নিল কেরামত। তাই আজ সন্ধ্যা ও রাতে চন্দ্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিল সে। নভোঃমন্ডলিক দূর্লভ একটা ব্যাপারের দর্শক হতে যাচ্ছে, ভাবতেই কেমন যেন পুলক বোধ করল কেরামত।

গতরাতে বাসার বেডরুমে শুয়ে শুয়ে এ বিষয়ে অনেকের সাথে মোবাইলে আলাপ-আলোচনা করে আরো কৌতুহলী হয়ে উঠল কেরামত। এদিকে তার মোবাইল আলোচনা শুনে বউ কিন্তু কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগল। সুপার, মুন এসবের মানে জিজ্ঞেস করেছিল কেরামতের বউ মলকা বানু। কিন্তু কেরামতের কড়া এক ধমক খেয়ে বেচারী চুপ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু মেয়েরা বরাবরই সন্দেহপ্রবন। সকালে কেরামত বের হয়ে গেলে মলকা বানু পাশের বাসার (মাথামোটা) ভাবীর সাথে জরুরী পরামর্শে বসল। অন্যকিছু গোপন রেখে সুপার ও মুন শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করল। ভাবী বললেন “সুপার” শব্দের অর্থ সুন্দর ও “মুন” মেয়েদের নাম। অর্থাৎ সুন্দরী মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপার ? শুনেতো মলকা বানুর আক্কেল গুড়ুম !

মুখভার করে বাসায় চলে এল সে। দুপুরের পর কেরামত বাসায় এসে খেয়েদেয়ে কিছুক্ষন ঘুমিয়ে নিল। আজ কেমন জানি বউয়ের মনভার, অন্যদিনের মত বাকবাকুম স্বরে কথা বলা বন্ধ ও বাসায় গুমোট একটা পরিবেশ।

ব্যাপারটাকে তেমন পাত্তা না দিয়ে শেষ বিকেলে উঠে চা খেয়ে বের হয়ে গেল সে। এরপর সমুদ্র সৈকতে গিয়ে বালিয়াড়ীতে আয়েশ করে বসল কেরামত। সন্ধ্যার পরেই আকাশে বিশাল গোল থালার মত চাঁদ দেখা দিল। শুরু হল সুপারমুন দর্শন। আজকের চাঁদটা আসলেই একটু কাছে কাছে মনে হচ্ছে। আবার চাঁদের আলোও অনেকগুন বেশী। মায়াবী আলোয় যেন ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী। কিন্তু সন্ধ্যার আগে থেকেই কেরামত লক্ষ্য করছিল, তার একটু দুরে আরেক বালিয়াড়ীতে আপাদমস্তক বোরকা আবৃত একটা নারী বসে আছে। চাঁদ যত উপরে উঠছিল আলোও ততই বাড়ছিল।

কিছুক্ষণ পরে আলট্রামডার্ণ ও ড্যামকেয়ার টাইপের এক নারী পর্যটক কেরামত আলীর পাশে এসে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কোথায় জিজ্ঞেস করল। কেরামত লোকেশন দেখিয়ে দিল। বেচারী বোধ হয় অনেক্ষন হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, সেখানে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে কেরামতের সাথে টুকটাক কথা বলছিল।

হঠাৎ কেরামত লক্ষ্য করল, অন্য বালিয়াড়ীতে সন্ধ্যা থেকে বসা বোরকাআবৃত মহিলা রনরঙ্গিনী ভঙ্গিমায় এদিকে ছুটে আসছে। ততক্ষনে মুখের নেকাব খুলে ফেলা মহিলাটি কাছে আসতেই দেখল তার বউ মলকা বানু! মনে মনে প্রমাদ গুণল কেরামত।

বাঁজখাই গলায় চিল্লাচিল্লি শুরু করল মলকা বানু। “ও, এই তাহলে তোমার সুন্দরী মুন (সুপারমুন), টাংকি মারার আর জায়গা পাওনা, মোখপোড়া মিনসে কোথাকার, এই টাংকিবাজি করার জন্যই কয়েকদিন আগে থেকে মোবাইলে গুজুর-গুজুর করছ ? সেই বিকাল থেকেই তোমাকে ফলো করছি। এবার ধরা পড়েছ, এখন বুঝবে মজা,” ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এদিকে এসব খিস্তিখেউড়ে পর্যটক বেচারী হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে। কেরামত মিনমিনে গলায় কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু বউয়ের উচ্চকন্ঠে সব চাপা পড়ে গেল। এদিকে হট্টগোল শুনে ধীরে ধীরে জটলা বাড়তে শুরু করছে। শেষ বারের মত বউকে বুঝাতে চেষ্টা করল কেরামত আলী। কিন্তু “লম্পট, লুচ্চা বেটা, বদমাইশ কোথাকার” বলে মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে এল মলকা বানু। তখন অবস্হা বেগতিক দেখে পৈত্রিক জানটা নিয়ে ভোঁ-দৌড় দিল কেরামত আলী।

আকাশে তখন চাঁদের আলো আরো প্রকট হয়েছে, সবাই সুপারমুন উপভোগে ব্যস্ত। কিন্তু কেরামত সমানে দৌঁড়াচ্ছে। নারী নির্যাতন দমন আইনের পাশাপাশি পুরুষ নির্যাতন দমন আইন কখন পাশ করা হবে, প্রহর গুনে কেরামত আলী।

সুপার মুন দর্শনে গিয়ে সুপার ঝামেলার শিকার হয়ে পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও কুতুব মামুর বিয়ে না করার রহস্যটা এবার বুঝল কেরামত।

লোকগায়ক সিরাজের বিখ্যাত একটা গান মনে পড়ল তার,

“আঁরা পুরুষ নির্যাতনর আইন সরকারত্তোন চাই”।
মনে মনে গানটা আওড়াতে আওড়াতে পিছন ফিরে দেখল, মলকা বানু এই তাকে ধরল বলে। তখন দৌঁড়ের গতি আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিল কেরামত আলী।

উসাইন বোল্টের রেকর্ড আজ যেন না ভাঙ্গলেই নয় !!

লেখাটা বিভিন্ন অনলাইন ও পত্রিকায় ২০১৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকদের অনুরোধে আজ আবার চর্বিত চর্বন, কারন আজও সুপারমুন তবে লেখাটা ঈষৎ সম্পাদিত।

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top