যার হাত ধরে বাংলা গানের নতুন ধারা: হাবিব ওয়াহিদ

9dd67_bf626af330_long-3.jpg

অস্কারজয়ী সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমান। এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিল্পীর জনপ্রিয়তা গোটা বিশ্বজুড়ে। মিউজিকে ভিন্নতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। ঠিক এ আর রহমানের মতোই বাংলাদেশে একজন শিল্পীর আগমন ঘটেছিলো একবিংশ শতাব্দীর শূন্য দশকে। মিউজিকের ওপর অসামান্য দখল নিয়ে যাত্রা করা এই শিল্পী পেয়েছেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাও। বলছি এই প্রজন্মের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক হাবিব ওয়াহিদের কথা।

কারো কারো কাছে হাবিব বাংলাদেশের এ আর রহমান। বাংলা লোকগানের সঙ্গে আধুনিক সুর ও মিউজিকের ফিউশন করে তিনি অনন্য এক ধারা সৃষ্টি করেছেন, যা গত প্রায় দেড় যুগে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তার দেখানো পথে সামিল হয়েছে এই প্রজন্মের অনেক সঙ্গীত পরিচালক। জনপ্রিয় গায়ক-সঙ্গীত পরিচালক আরফিন রুমি, ইমরান ও প্রীতম হাসানেরা হাবিবের দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত।

আজ এই গুণী গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালকের ৩৯তম জন্মদিন। ১৯৭৯ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন হাবিব। পড়াশোনা করেন ধানমন্ডির সাউথব্রিজ স্কুলে। জন্মসূত্রে হাবিব সংগীত পরিবারের সন্তান। তার বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদ আধুনিক বাংলা পপ সংগীতের পথদ্রষ্টা ছিলেন। ১৯৭০ ও ১৯৮০’র দশকে ফেরদৌস ওয়াহিদ বাংলা পপ সঙ্গীতকে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। হাবিব তাই ছোটবেলাতেই তার পিতার কী-বোর্ড থেকে সুর করতে শেখেন। পরে তিনি স্কুল অব অডিও ইঞ্জিনিয়ারিং (লন্ডনে) শব্দ প্রকৌশলে অধ্যয়ন করেন। এসময় তিনি এশিয়ান আন্ডারগ্রাউন্ডের নিতিনের সাথে কাজ করার সুযোগ পান।

 

 

গানের বাজারে হাবিবের প্রবেশ ছাত্র থাকা অবস্থায়ই। ২০০২ সালের দিকে লন্ডনে থাকতে তিনি প্রথম লোকসঙ্গীতের একটি রিমিক্স অ্যালবাম করেন। এর নাম ‘কৃষ্ণ’। লন্ডনের একজন সিলেটি রেস্তোঁরার মালিক কায়া ছিলেন একজন অপরিনত গায়ক। কিন্তু তার মত কন্ঠই হাবিব চেয়েছিলেন। তাই কায়াকে দিয়েই হাবিব ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামে গান করেন। এরপর গানগুলো লন্ডনেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে যখন এই অ্যালবাম ‘কৃষ্ণ’ শিরোনামে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে মুক্তি পায়, তখন সেটি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এতে ছিল পুরোনো স্বাদের লোকসঙ্গীত এবং পাশ্চাত্যের ইলেকট্রনিকার মিশ্রণ যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রচলিত হয়।

এরপর দেশের সঙ্গীত জগতে হাবিবের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সৃষ্টি করতে থাকেন গান। আর জয় করে নিতে থাকেন কোটি কোটি শ্রোতার মন।

২০০৪ ও ২০০৫ পরপর দুই বছরে দুটি অ্যালবাম নিয়ে আসেন হাবিব। সেগুলোর নাম ছিল ‘মায়া’ ও ‘ময়না গো’। দুটি অ্যালবামই তখন বিক্রির শীর্ষে ছিল। এই দুই অ্যালবামে গান করে জনপ্রিয়তা পান বেশ কয়েকজন নবীন শিল্পী। তারা হলেন, কায়া, হেলাল, জুলি, কনিকা ও নির্ঝর। এছাড়া হাবিব নিজেও ‘ময়না গো’ অ্যালবামের মাধ্যমে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার ব্যতিক্রম গায়কীও শ্রোতাদের কাছে ভালো লেগে যায়।

 

 

এরপরে তার ঝুলিতে কেবল সাফল্যই এসে ধরা দিয়েছে। একের পর এক অ্যালবাম করেছেন, আর সেগুলো ছুঁয়েছে জনপ্রিয়তার আকাশ। তার সৃষ্ট অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘শোন’, ‘পাঞ্জাবীওয়ালা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’, ‘এই তো প্রেম’, ‘চন্দ্র গ্রহণ’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘অবশেষে’, ‘প্রজাপতি’, ‘আহবান’, ‘বলছি তোমাকে’, ‘রঙ’, ‘স্বাধীন’, ‘তুমি সুন্দর মেঘমালা’ ইত্যাদি।

গত কয়েক বছরে অ্যালবামের প্রচলন উঠে গেছে। শ্রোতারা এখন আর অ্যালবাম কিনে গান শোনেন না। ইউটিউবে সিঙ্গেল গান-মিউজিক ভিডিও নিয়েই ব্যস্ত সবাই। তাই হাবিবও সেই পথে হেঁটেছেন। উপহার দিয়েছেন ‘হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা’, ‘মন ঘুমায় রে’, ‘তোমার আকাশ’, ‘মনের ঠিকানা’, ‘তুমি হীনা’, ‘ঝড়’, ‘মিথ্যে নয়’, ‘আবার তুই’, ‘আলিঙ্গন’, ‘আনমনা মন’, ‘মন তুই’, ‘মনের কিনারায়’ শিরোনামের সিঙ্গেল গানগুলো।

গানের জন্য শ্রোতারের ভালোবাসার পাশাপাশি হাবিব ওয়াহিদ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননাও। ‘প্রজাপতি’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা করে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। এছাড়া ছয়টি মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারও রয়েছে তার ঝুলিতে।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন
Top