সমুদ্র সৈকতে নানা আনন্দায়োজনে শেষ হলো রাখাইনদের বর্ষা উৎসব

-বর্ষা-উৎসব.jpg

সুনীল বড়ুয়া :
একপাশে উপচে পড়ছে সাগরের উত্তাল ঢেউ, অন্য পাশে সবুজ ঝাউবন। এরিই মাঝে চলছে রোদ বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা। যেন অসাধারণ সুন্দরের মাঝেই চলছে আবাল বৃদ্ধ বনিতার মহা মিলন মেলা।যেন এক অন্য রকম আনন্দায়োজন।যে উৎসবটি স্থানীয়ভাবে বর্ষা উৎসব হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এটি পালন করে রাখাইন সম্প্রদায়।
বলছিলাম, বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের শৈবাল পয়েন্টের ঝাউ বাগানে অনুষ্ঠিত রাখাইনদের মনরাঙানো বর্ষা উৎসবের কথা। শুক্রবার (১২ জুলাই) ছিল প্রায় আড়াইমাসব্যাপী এ উৎসবের শেষ দিন। সারাদিন ঝাউবাগানে অন্য রকম আনন্দ উপভোগের পর সন্ধ্যায় সমুদ্রস্নান শেষে উৎসবের ইতি ঘটালো হাজারো প্রাণ। গত ২৪ মে শুরু হয় এ উৎ’সব ।
জানা গেছে, প্রতি বছর বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান তিনমাসব্যাপী আষাঢী পূর্ণিমার আগে (আষাড়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত) আড়াই থেকে তিনমাস সৈকতে এ উৎসব পালন করে থাকে রাখাইন সম্প্রদায়। এটি তাদের কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসব নয়, শুধুমাত্র সবাই মিলে মিশে বৃষ্টি এবং সাগরের জলে সিক্ত হয়ে মহা আনন্দে মেতে ওঠার জন্যই এ উৎসব।
সৈকতের ঝাউবাগানে গোল করে বসে মজার আড্ডায় মেতেছিল রাখাইন তরুণ-তরুণী এছেংখিং, উসিবু ও কেংগ্রীসহ ১৫জনের একটি দল। তাদের মধ্যে খিনছেন মে বলেন, এখানে শুধু মাত্র এনজয় করার জন্য আমরা এখানে আসি। এখানে এলেই পুরনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়। খুব ভাল লাগে।
কেংগ্রী ও উসিবু বলেন, এ উৎসবের সাথে ধর্মীয় উৎসবের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সকল দ্বিধা-দ্বন্ধ,সংঘাত হানাহানি ভুলে সবাই মিলে নেচে গেয়ে আনন্দ উল্লাস করে সারাদিন আনন্দে মেতে থাকার জন্যই মূলত এ আয়োজন।
ঢাকা থেকে স্বামীর সঙ্গে উৎসবে যোগ দেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক উমে রাখাইন। তিনি বলেন, উৎসবে এলেই একান্তই নিজের মতো কিছুটা সময় কাটানো যায়। অনেক পুরনো বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়। তাই প্রতি বছর এখানে আসার লোভ সামলাতে পারিনা। আর এবারের উৎসবটি ছিল আরও আনন্দময়।
উৎসবে এসে কেমন লাগছে? এমন প্রশ্নে রাখাইন যুবক আছিং রাখাইন বলেন,সবাই মিলে-মিশে বৃষ্টি এবং সাগরের জলে সিক্ত হয়ে আনন্দে মেতে ওঠার জন্যই মূলত এখানে আসা। অনেকেই এটিকে বরষা কালীন পিকনিকও বলছে। আমি বলব,এ উৎসবের মধ্যদিয়ে বরষাকে বরণ করা। তিনি বলেন, আজ সারাদিন খুব একটা বৃষ্টি ছিলনা। বিকালের দিকে নামে মুষল ধারে বৃষ্টি। যে বৃষ্টি সবার আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
‘এখানে না আসলে বুঝতে পারতামনা,আসলেই এ উৎসব কতটা রঙ্গিন,কতটা আনন্দ মুখর। সত্যিই মুগ্ধ হবার মতো’।বললেন ব্যাংকার ঝন্টু বড়ুয়া।ঝন্টুর মতে, এ উৎসব রাখাইন সম্প্রদায়ের হলেও উৎসবের রঙ কিন্তু সার্বজনীন।
বর্ষা উৎসবের শেষ আনন্দ সমুদ্র স্নান। সারাদিন ঝাউবাগানে নেচে গেয়ে মন রাঙ্গিয়ে দিনের শেষ লগ্নে সমুদ্র ¯স্নান শেষে বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরা।
রাখাইন নেত্রী মাটিন টিন জানান, ধর্মীয় রীতিনীতির সাথে এ উৎসবের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র মজা করার জন্য শতাব্দীকাল ধরে রাখাইন সম্প্রদায় এ উৎসব পালন করে আসছে। প্রথম দিকে হিমছড়ির জঙ্গলে উৎসব পালন করা হতো এবং শুধু কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায় এ উৎসব পালন করতো। রাখাইন তরুণ-তরুনীরা নানা রকমের খাবার দাবারসহ চলে যেতো সেখানে। গত তিন দশক ধরে সমুদ্র আর প্রকৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে কাছে পেতে সৈকতের ঝাউবাগানে পালন করা হচ্ছে মন রাঙ্গানো এ বর্ষা উৎসব।
অনেকের মতে.বর্ষা উৎসব এখন আর শুধুমাত্র কক্সবাজারের রাখাইনদের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। জেলার গন্ডি পেরিয়ে বান্দরবান,রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি থেকেও লোকজন এ উৎসবে যোগ দিচ্ছে। যোগ দিচ্ছেন অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনও।

আপনার মন্তব্য লিখুন