শেষ সময়ে ধর্মঘটে বেকায়দায় সরকার

dhaka-1-20181029182430-1.jpg

ডেস্ক নিউজ

নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। সপ্তাহ গড়ালেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। সরকারি দল পুরোদমে মাঠে নেমেছে প্রচার-প্রচারণায়। আবার নির্বাচন ঘিরেই আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে বিরোধী শক্তি ঐক্যফ্রন্ট। ফের আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ-শঙ্কাও আছে। এমন শঙ্কা থেকেই কৌশলী অবস্থান নিয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এবং ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলন সামাল দিয়েছে সরকার। মনে করা হয়, নতুন নতুন আইন তৈরি আর দাবি মানার প্রসঙ্গ সরকারের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে নির্বাচনী পরিবেশ ঠিক রাখতেই।

কিন্তু ওই দুই আন্দোলন সামাল দিতে না দিতেই শ্রমিকদের অসহনীয় ধর্মঘটে ফের বিব্রত সরকার। টানা ৪৮ ঘণ্টার আন্দোলনে প্রায় বেকায়দায় পড়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা বা সমাধানের উদ্যোগ না নেয়ায় জনমনে ক্ষোভও বাসা বেঁধেছে। ধর্মঘট প্রত্যাহারে কার্যকর কোনো পদেক্ষপ নিতে না পারাকে রাষ্ট্রের উদাসীনতাও মনে করছেন অনেকে।

নির্বাচনের আগে এমন ধর্মঘট কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না বলে মনে করেন সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতারাও। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘জনদুর্ভোগে আমরা ব্যথিত। নির্বাচনের আগে এমন আন্দোলনে সরকার রীতিমতো বিব্রত। মানুষকে জিম্মি করে এমন আন্দোলন কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না।’

আন্দোলনের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসিচব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ খানের সঙ্গে। তিনি বলেন ‘এই আন্দোলনের সঙ্গে মালিকপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবুও আমরা সমাধানের পথ বের করতে শ্রমিক নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসছি।’

‘ধর্মঘটের আগেও বসতে পারতেন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বিষয়টি সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনের মধ্যকার। শ্রমিকদের দাবি সরকারের দেখার কথা। শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন বলেও আমার জানা নেই।’

সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবি আদায়ে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ গোটা দেশ। সড়কে কোনো প্রকার গণপরিবহন না থাকায় দিশেহারা যাত্রী সাধারণ। গণপরিবহনও চলছে না টানা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটে। মানুষ অতি প্রয়োজনেও গন্তব্যে যাওয়ার উপায় পাচ্ছে না। অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ভ্যান, রিকশা চললেও তা যাত্রীর তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। আবার এসব পরিবহনে ভাড়াও বেড়েছে কয়েকগুণ।

ধর্মঘটে নাকাল দেশবাসী বিরূপ মনোভাব পোষণ করে আসছেন ধর্মঘটের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। ধর্মঘটের নামে এমন দায়িত্বহীন আন্দোলনকে অনেকে নৈরাজ্যও মনে করছেন। সমালোচনার ঝড় বইছে সর্বমহলে। সরকার, শ্রমিক, মালিককে দোষারোপ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা হচ্ছে। সড়কে ভোগান্তির অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ভুক্তভোগীরা পোস্ট দিচ্ছেন ফেসবুক, টুইটারেও।

সোমবার দুপুরে বাড্ডা লিংক রোডে অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন আইয়ুব আলী। বাড়ি ময়মনসিংহে। স্ত্রী-সন্তানসহ ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন তিনদিন আগে। এখন ধর্মঘটের ফাঁদে আটকা। গতকালই যাওয়ার কথা ছিল। সড়কে দীর্ঘ অপেক্ষা করে আত্মীয়ের বাসায় ফিরে গেছেন। জরুরি ফিরতে হবে বলে আজ সকাল থেকে ফের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। অটোরিকশার দেখা পাইলেও তাতে উঠতে পারেননি। কোনো রকমে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে যেতে পারলেই ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আইয়ুবের অপেক্ষা যেন বিফলেই যাচ্ছে। বিরক্তির ছাপ চোখেমুখে। বলেন, ‘এভাবে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে পারে না। যে যখন চাইছে তখনই অচল করে দিচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা। সরকার চাইলে সমাধানের পথ খুঁজতেই পারত।’

আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চাইলেই এখন এই আইন পরিবর্তন করা সম্ভব না। ফের অধিবেশন বসতে হবে। নির্বাচনের পর ছাড়া আইনের পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

সরকারের নৌমন্ত্রী এবং শ্রমিক নেতা শাহজাহান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চলমান আন্দোলনে তার (শাজাহান খান) কোনো সম্পৃক্ততা আছে বলে আমরা মনে করছি না। বরং তিনি সমাধানের জন্য শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করছেন। শেষবেলায় কোনো আন্দোলনের কারণে সরকার বেকায়দায় পড়ুক, তা সরকারের কেউই চাইবে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীর সঙ্গে কথা বলা হয় এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন নিয়ে কর্মবিরতি পালন করছি। সরকারকে বেকায়দায় ফেলানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সরকারকে এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি। নইলে ফের ৯৬ ঘণ্টার অবরোধে যাব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমোদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

কাভার্টভ্যান চালক সমিতির সভাপতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের সদস্য কামারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার চাইলে এক ঘণ্টায় সমাধান দিতে পারে। অনেক আইন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ দিয়ে বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে। শ্রমিকের খবর নেয় না কেউ। হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় কুকুরের মতো মারা যায়। শ্রমিকের লাশ ছুঁতেও মানা। অথচ ১০৫টি কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে পাঁচটি কারণ চালকের। সব ঠিক না করে শ্রমিকের ওপর গজব নামিয়ে দেয়া কোনো ন্যায়বিচার হতে পারে না।’

জাগো নিউজ

আপনার মন্তব্য লিখুন