‘লাল ফিতাই’ আটক সৈকত উন্নয়ন পরিকল্পনা

-সৈকত-উন্নয়ন-পরিকল্পনা-1.jpg

এম বেদারুল আলম :

সরকার বিগত ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করলে ও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নানা কারণে শ্রীহিন হয়ে পড়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। সন্ধ্যা নামলেই সমুদ্র সৈকত জুড়ে নেমে আসে ভুতুঁড়ে অন্ধকার। লাইট পোষ্টে পর্যাপ্ত বাল্ব নেই। প্রধান বীচ পয়েন্ট জুড়ে জরাজীর্ণ ভাসমান দোকানের সারি কিছুটা উচ্ছেদ হলে ও দিনে বালিয়াড়িতে কুকুর আর গরুর উৎপাত দেখে অনেকে মনে করেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত যেন সত্যিই অভিভাবকহীন। পর্যটন ব্যবসাকে ঘিরে এখানকার অর্ধ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হলেও সৈকতের জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে দিন দিন শ্রীহিন হয়ে পড়ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিষ্ট পুলিশ থাকলেও থেমে নেই রিক্সাচালক ও ভাসমান হকারদের দৌরাত্ম্য। সম্প্রতি হকারদের কার্ড বিক্রি করে কোটি টাকা আয়কারিদের মুখোশ উন্মুক্ত হওয়ার পর বিষয়টি সর্বত্র আলাচনা সমালোচনার ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজাররের স্থানীয় মানুষকে বোকা বানিয়ে উন্নয়নের বরাদ্দ তসরুপকারিদের ব্যাপারে সজাগ হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এদিকে ২০১৬ সালে নেয়া প্রকল্প বিশেষ করে এক্সক্লুসিভ টুরিষ্ট জোন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সী নেটিং সিস্টেম, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আলাদা জোন, ওয়াচ টাওয়ার, আলাদা নিরাপত্তা বলয় সহ বিভিন্ন পরিকল্পনা দীর্ঘ ৩ বছরে তার আংশিক ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। ফলে কক্সবাজার সমুদ্র  সৈকত দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও সৈকতকে থাকতে হচ্ছে অবহেলিত।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহন করলে ও  কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বরং নানা অবহেলা, প্রশাসনিক সমস্যা কারণে বৃহৎ সমুদ্র সৈকত এখন অনেকটাই মৃত। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ সৈকতের বিদ্যুতের খুঁটি থাকলেও বাল্ব লাগানো হয়নি। সন্ধ্যা নামলেই বেড়ে যায় বখাটেদের  উৎপাত, নির্বিঘেœ পর্যটকরা ঘুরাফেরা করতে ভয় পান। প্রধান বীচ থেকে ডায়বেটিক পয়েন্ট পর্যন্ত চলার পথটিতে বালি জমে বন্ধ হয়ে া৩য় পৃষ্ঠার ৩ কলামে দেখুনা
সৈকত উন্নয়ন পরিকল্পনা
(১ম পৃৃষ্ঠার পর)
গেছে। বালির নিচে পড়ে গেছে ২ কিলোমিটারের ওয়াকওয়ে। এছাড়া দূর দূরান্ত থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা সমুদ্রে নামতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন।
সৈকতের সবচেয়ে বড়  সমস্যা পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেটের। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সৈকতে একটি টয়লেট নির্মান করলেও ক্রমবর্ধমান পর্যটকদের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে পর্যটকদের প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হোটেল কক্ষে চলে যেতে হয়।কক্সবাজার ঝিনুক শিল্প সমিতির এক নেতা পর্যটকদের জন্য নির্মিত টয়লেটটি দখল করে ভাড়া দেওয়ায় পর্যটকরা প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হোটেলে চলে যেতে বাধ্য হয়। ফলে বহাল তবিয়তে দখলদাররা দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দূর- দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক পাশের মসজিদের টয়লেট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া ট্যুরিষ্ট পুলিশের  আরো পর্যটক বান্ধব হওয়া জরুরি। সৈকতে চাদাঁবাজ, ইভটিজার , ছিনতাইকারিদের দৌরাত্ব্য,এমনকি গত বছর একজন ব্যবসায়ি খুনের ঘটনায় অনেকের কাছে অনিরাপদ মনে হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত।এছাড়া সন্ধ্যার পর কলাতলীর লাবণি পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, সী ইন পয়েন্ট, ডায়বেটিক পয়েন্ট সহ অন্ততঃ ৬টি পয়েন্টে ভাসমান পতিতার অবাধে চলাচল সমুদ্র সৈকতের পরিবেশকে ভারি করে রাখে। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা ঘাটতি চরম আকার ধারন করছে। প্রতিবছর কক্সবাজারে লাখ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে । প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পায় কক্সবাজার। ঘাটতি পূরণে ব্যবসায়িরা বাড়তি লোক নিয়োগ দিয়ে ব্যবসা চালালেও বিনিয়োগ ফিরে পেতে তা পর্যাপ্ত নয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে। সরকার গৃহিত পদক্ষেপ সমুহ বাস্তবায়ন হলে এবং পর্যটন এলাকাকে আকর্ষনীয় করে গড়ে তোলা হলে দেশের অর্থনীতিতে বহুগুনে অবদান রাখবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের হতশ্রি অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা এবং সরকারের নেয়া পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। বিভিন্ন সময়ে পর্যটন মন্ত্রী,বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সচিব কক্সবাজার পরির্দশনে এসে সমুদ্রে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সী নেটিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ গ্রহনের আশ্বাস প্রদান করলেও তা অদ্যাবধি বাস্তবায়ন হয়নি। পর্যটন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা সমুদ্র সৈকতকে পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তোলার আহবান জানান। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ও  দাবি জানান। জেলার পর্যটনের প্রাণ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে নিয়ে স্থানীয় পর্যটন বান্ধব ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠনের ও দাবি জানান পর্যটন ব্যবসায়িরা।
এদিকে ফেডারেশন অব টুরিজম বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল কাশেম সিকদার জানান, কক্সবাজার সৈকতের উন্নয়ন নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয় কিন্তু বাস্তবায়ন হয়না। অথচ এ মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার কলাতলি থেকে হলিডে মোড পর্যন্ত এবং শহীদ স্মরণী সড়কের সংস্কার। এছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে বিকল্প সড়ক হিসাবে সীইন পয়েন্ট থেকে সী ক্রাউন্ট পর্যন্ত সড়কের নির্মাণ কাজ। এটি হলে প্রধান সড়কের উপর চাপ কমবে। পর্যটন এলাকার ড্রেনেজ ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা আরো জরুরি। দুর-দুরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের শিশুদের জন্য প্রয়োজন শিশুপার্ক ও শিশুতোষ বিনোদন কেন্দ্র নির্মান ও সময়ের দাবি।
সৈকত ঝিনুক শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি মোঃ কাশেম আলী বলেন, পর্যটকদের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট খুবই জরুরি। যে কয়েকটা টয়লেট আছে তা দখলে চলে যাওয়ায় পর্যটকদের চরম সমস্যার সম্মুখিন হতে হয় পর্যটন মওসুমে।
সমুদ্র সৈকতসহ পর্যটন এলাকার আইন শৃংখলা উন্নয়ন ও পর্যটকদের নিরাপত্তা বিষয়ে টুরিস্ট পুলিশের এসপি জিল্লুর রহমান বলেন-পর্যটকদের শতভাগ নিরাপত্তার জন্য যা করা প্রয়োজন তা আমরা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমাদের ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম, ইভটিজিং প্রিভেশন টিম, কুইক রেসপন্স টিম, বীচ বাইক পেট্রল টিম পর্যটকদের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। ছিনতাই, চুরি এবং পর্যটকদের নানা হয়রানি রোধে আমাদের টিম সার্বিক সেবা দিতে প্রস্তুত এবং করে যাচ্ছে। আশা করি সামনে আরো পর্যটনবান্ধব সেবা নিয়ে আমরা হাজির হতে পারব।
এদিকে সমুদ্র সৈকতের উন্নয়ন ও গৃহিত প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উন্নয়ন ও মানব সম্পদ মোঃ সরওয়ার কামাল জানান, ২০১৬ সালের গৃহিত সমুদ্র সৈকত উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়াও আরো কয়েকটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু চলমান ও রয়েছে। গৃহিত প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত উন্নয়ন, পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিশেষ ট্যুরিষ্ট জোন, জলবায়ু তহবিল থেকে সৈকতের ভাঙ্গনরোধে ঝাউগাছ বা গাছরোপন প্রকল্প অন্যতম। এছাড়া কোরিয়ান একটি কোম্পানী বাস্তবায়ন করছে জালিয়াদ্বীপে বিশেষ একটি প্রকল্প। পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় যে প্রকল্পটি গ্রহন করেছে সেটি ও অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সমিতিপাড়ার শুটকি পল্লী থেকে ৩ স্তরের রাস্তা নির্মান করা হবে যেটি শেষ হবে টেকনাফ বাহারছড়া পর্যন্ত। প্রকল্পগুলো অতিশীগ্রই বাস্তবায়ন হবে বলে দৈনিক কক্সবাজারকে তিনি জানান।
বিশ্বের সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে সরকার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করলেও কাংখিত উন্নয়ন না হওয়ায় হতাশ কক্সবাজারবাসী। ২০১৬ সালের গৃহিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাতিলের পর বর্তমানে গৃহিত পর্যটকবান্ধব প্রকল্প আদৌ আলোর মুখ দেখে কিনা সেটি দেখার অপেক্ষায় কক্সবাজারবাসী।

আপনার মন্তব্য লিখুন