ভারতীয় অর্থনীতি বাঁচাতে রিজার্ভ ব্যাংকের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক

-অর্থনীতি.jpg

অর্থনৈতিক সংকটের হাত থেকে বাঁচাতে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক তার বাড়তি সঞ্চয় কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস দেশের বেহাল অর্থনীতি নিয়ে অবিলম্বে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। ওই দলের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, এটা হলো ডাক্তারখানা থেকে ব্যান্ডএইড চুরি করে ক্ষত ঢাকার চেষ্টার মতো একটি কাজ।

রাহুল বলেছেন, দেশের অর্থনীতির দফারফা করে নরেন্দ্র মোদির সরকার এখন রিজার্ভ ব্যাংকের জমানো টাকায় ভাগ বসিয়েছে। এভাবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারে থাবা বসিয়ে সরকার পরিস্থিতির সামাল দিতে পারবে না।

রিজার্ভ ব্যাংকের বাড়তি সঞ্চয়ের টাকায় কোষাগার ঘাটতির সামাল দেওয়া নিয়ে বিতর্ক চলছিল বেশ কিছুকাল ধরেই। কিন্তু পূর্বতন গভর্নররা এভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। রঘুরাম রাজনের সঙ্গে এ নিয়ে বিজেপি সরকারের বনেনি। বাধ্য হয়ে মেয়াদ ফুরোলে তিনি পড়াশোনার জগতে ফিরে যান। পরবর্তী গভর্নর উর্জিত প্যাটেলও রাজি ছিলেন না। তাঁর ডেপুটি ভিরাল আচারিয়াও এই দাবি না মেনে পদত্যাগ করেন। তাঁদেরও আগে দুই গভর্নর ডি সুব্বারাও এবং ওয়াই ভি রেড্ডিও অরাজি ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আমলাশাহি থেকে টেনে এনে মোদি সরকার রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর করেন শক্তিকান্ত দাসকে। তিনি সাবেক গভর্নর বিমল জালানের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করেন, তারই সুপারিশমতো সরকারকে বাড়তি অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রিজার্ভ ব্যাংক তার বাড়তি সঞ্চয় থেকে ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি রুপি সরকারকে দেয়। আজ সকালেই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারকে একহাত নেন রাহুল। টুইট করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছেন। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে হাত বাড়িয়েছেন রিজার্ভ ব্যাংকের সঞ্চয়ে। কিন্তু এতে লাভ হবে না। এটা ডাক্তারখানা থেকে ব্যান্ডএইড চুরি করে ক্ষত ঢাকার মতো। পরে কংগ্রেস দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে তুলোধোনো করেন কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা। দেশের বেহাল অর্থনীতি নিয়ে তিনি অবিলম্বে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান।

রিজার্ভ ব্যাংক যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা সরকারকে দিচ্ছে, তার মধ্যে ১ কোটি ২৩ লাখ ৪১৪ কোটি যাবে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত সঞ্চয় থেকে, বাকি ৫২ হাজার ৬৩৭ কোটি ঝুঁকির মোকাবিলায় তুলে রাখা বরাদ্দ থেকে। ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ থেকে আগেই দেওয়া হয়েছে ২৮ হাজার কোটি রুপি।

ভারতের অর্থনীতির হাল এই মুহূর্তে বেশ নাজুক। গাড়িশিল্পে প্রবল মন্দা। একের পর এক গাড়ি তৈরির কারখানা কর্মী ছাঁটাই করছে। মন্দা ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প ও কৃষি উৎপাদনেও। গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে পার্লের মতো বিস্কুটশিল্প, যারা মাত্র পাঁচ রুপিতে এক প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি করে, তারা ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। নগদের জোগান কমে যাওয়ায় গৃহনির্মাণ ও অন্যান্য শিল্প মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। দেশের প্রবৃদ্ধির হার নিম্নগামী। কোষাগার ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে। জনমুখী কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে। ডলারের তুলনায় রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪ শতাংশের বেশি। বেকারত্ব বাড়ছে। এ অবস্থায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি রুপির বাড়তি পাওনা সরকারের কাছে বাড়তি অক্সিজেনের মতো। কিন্তু অর্থনীতির এই মন্দাভাব তাতে কাটানো সম্ভব হবে কি না, জল্পনা শুরু হয়েছে তা নিয়েই।

রিজার্ভ ব্যাংকের ভাঁড়ার থেকে রাজকোষ ঘাটতি মেটাতে আগেও টাকা দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ১০ কোটি রুপি, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ হাজার ৮৭৬ কোটি। ২০১৭ সালে তা ৩০ হাজার ৬৫৯ কোটিতে নেমে এলেও ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার কোটি। এবার ২০১৯ সালে তা তিন গুণের বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটিতে। পরিস্থিতির সামাল দিয়ে সরকারকে বাঁচাতে এ সিদ্ধান্ত অভূতপূর্ব। ব্যাংকের মোট আমানতের অন্তত সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ বাস্তবে মজুত রাখতে হয়, যাকে ব্যাংকিং পরিভাষায় বলা হয় ‘রিয়েলাইজড ইক্যুইটি’। কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সেই মজুত সবচেয়ে কম অবস্থায় এসে দাঁড়াল। যার ফলে তার আন্তর্জাতিক রেটিং কমে গেছে। দেশের অর্থনীতি কোন তলানিতে পৌঁছেছে, এটা তারই প্রমাণ।

আপনার মন্তব্য লিখুন