‘ভাই, ভোট দিতে গেছিলেন?’

48370065_2139768129607407_2242379034849705984_n-5.jpg

মোহাম্মদপুর শেখেরটেক ৩ নম্বর সড়কে এক পথচারী আরেকজনকে ডেকে জানতে চান-ভোট দিতে গেছিলেন? অন্যজন উত্তর দিলেন-না যাই নাই। তা আপনি কি ভোট দিতে গেছিলেন? প্রথম প্রশ্নকারী ব্যক্তি একগাল হেসে জানালেন, তিনি ভোট দিয়ে এসেছেন খুবই কম সময়ে। ভোট দেওয়ার পরামর্শও দিলেন তিনি। তারপর দুজন দুজনের পথে রওনা দিলেন।

ইভিএমে মক ভোট দিতে এসেছেন ভোটারেরা। ছবি: প্রথম আলোইভিএমে মক ভোট দিতে এসেছেন ভোটারেরা। ছবি: প্রথম আলো

এই দুই পথচারীর কথা শুনে কিছুটা চমকে যেতে হয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ তো ৩০ ডিসেম্বর। তাহলে ২৭ ডিসেম্বরে এই ব্যক্তি ভোট দিলেন কীভাবে?

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার দুইটি আসনে ( আসন ৬ এবং ১৩) ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) মক ভোট নেওয়া শুরু হয়েছে। সকাল ১০ টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত এ ভোটগ্রহণ। ভোটের দিন ইভিএমে কীভাবে ভোট দিতে হবে ভোটারদের তা জানানোর জন্যই এ মক ভোট শুরু হয়েছে।

আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের বেগম নূরজাহান মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল ভোট দেওয়ার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এটি হচ্ছে ঢাকা ১৩ এর ১৮৬ আসনের ৬০ নম্বর কেন্দ্র। ইভিএম মেশিন প্রস্তুত। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও সবাই উপস্থিত। তবে সে তুলনায় ভোটারের উপস্থিতি কম। অনেক ভোটার কেন্দ্রে এসে জানতে পারছেন তিনি এ কেন্দ্রের ভোটার নন। তমে দমে যাওয়ার পাত্র নন। এসেই যখন পড়েছেন, তখন ইভিএমে কীভাবে ভোট দিতে হয় তা শিখে যেতে চান। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও উৎসাহের সঙ্গেই শেখানোর দায়িত্ব পালন করছেন। এ যন্ত্র নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন, সন্দেহ আছে। সন্দেহ দূর করা বা ভোটারদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছেন।

জাল ভোট দিতে চাইলে এই লেখা উঠবে। ছবি: প্রথম আলোজাল ভোট দিতে চাইলে এই লেখা উঠবে। ছবি: প্রথম আলো

বেশ কয়েকজন ভোটারকে দেখা গেল, মনে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই কেন্দ্রে এসেছেন। ইভিএম মেশিনে জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড ঢোকানোর পর কোনো তথ্য দিতে একটু দেরি হওয়ায় একজন ভোটার উৎসাহের সঙ্গে বললেন,-বলছিলাম না যন্ত্রে সমস্যা আছে। দেখলেন তো কাজ করছে না। তবে মেশিন তথ্য জানাতে শুরু করলে ওই ভোটার বললেন, ভোট দেওয়া গেলে জাল ভোটও দেওয়া যাবে।
তবে ওই ভোটারকে এবারও হতাশ হতে হলো। কেননা, মক ভোটে অংশ নেওয়া এক ভোটারের স্মার্ট কার্ড মেশিনে আবার ঢোকানোর পর মেশিন জানিয়ে দিল-ওই ভোটার আগে ভোট দিয়েছেন। অবশেষে ওই ভোটারের মুখের হাসি আরও বিস্তৃত হলো।

ভোটে অংশ নিতে আসা ভোটারদের ইভিএমের বিস্তারিত তথ্য সংবলিত একটি লিফলেট দেওয়া হচ্ছে। তাতে লেখা আছে-ভোট দিন মাত্র দুই বোতাম চেপে। তাতে প্রথমে পছন্দের প্রতীকের পাশের বোতামটি চাপতে হবে। তারপর ভোট নিশ্চিত করতে মেশিনের সবুজ বোতামে চাপ দিতে হবে। এ মেশিনে ভোট দিতে হলে ভোটার তালিকা থেকে প্রাপ্ত ভোটার নম্বর অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে ভোটারকে। তারপর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সহায়তায় খুবই কম সময়ে ভোট দিতে পারবেন ভোটার।

ইভিএমে ভোট দেওয়া যাবে মাত্র দুটি বোতাম চেপে। ছবি: প্রথম আলোইভিএমে ভোট দেওয়া যাবে মাত্র দুটি বোতাম চেপে। ছবি: প্রথম আলো

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইভিএম মেশিনের সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ নেই বলে হ্যাকিং করার কোনো সুযোগ নেই। ইভিএম মেশিন ছিনতাই করে নিলেও জালভোট দেওয়া, কেন্দ্র দখল করে ভোট দেওয়া, একজনের ভোট অন্যের পক্ষে দেওয়া (ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে বা মৃত ভোটার) সম্ভব না। একবার ভোট দিয়ে দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের আগে মেশিন চালু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তাই ভোটগ্রহণ শুরুর আগে অবৈধভাবে ভোট গ্রহণ বা দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া পাসওয়ার্ড সংরক্ষিত বলে প্রিসাইডিং অফিসার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ছাড়া আর কেউ মেশিন চালু করতে পারবেন না। বায়োমেট্রিক যাচাই করা হয় বলে ভোট কারচুপির সুযোগ নেই। এ মেশিনে ভোট দেওয়ার পর মনিটরে কেন্দ্রে মোট কতটি ভোট সম্পন্ন হলো সে তথ্যও জানিয়ে দেওয়া হয়।

আজ সকালে বেগম নূরজাহান মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আসা ভোটারদের হাসিমুখেই ভোট কেন্দ্রে থেকে বের হতে দেখা গেল। অবসরে যাওয়া ব্যাংকার রাশেদ শামসুল করীম ভোট দিতে এসেছেন ছেলে রাফিদ করীমকে নিয়ে। রাফিদ এবারই প্রথম ভোট দেবেন। নতুন ভোটার হিসেবে তাঁর উচ্ছ্বাসটা একটু বেশি। এই বাবা-ছেলে জানালেন, তাঁরা মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক তিন নম্বরের বাসিন্দা। বুধবার তাঁরা তাঁদের মুঠোফোনে এ মক ভোটের তথ্য জেনেছেন।
রাশেদ শামসুল করীম জানালেন, এখানে যেভাবে ভোট নেওয়া হলো, আসল ভোটের দিনও যদি এ ব্যবস্থাই থাকে তাহলে তো খুব ভালো বলতে হবে। এত কম সময়ে ভোট দেওয়া সম্ভব তা বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

ভোট দেওয়ার পর প্রার্থী যে প্রতীকে ভোট দিয়েছেন সেটি তাঁকে জানানো হবে। ছবি: প্রথম আলোভোট দেওয়ার পর প্রার্থী যে প্রতীকে ভোট দিয়েছেন সেটি তাঁকে জানানো হবে। ছবি: প্রথম আলো

ব্যবসায়ী মোস্তাক আলী এবং জাকির আহমেদ কেন্দ্রে এসেছিলেন তাঁরা এ কেন্দ্রের ভোটার কি না তা জানতে। কেন্দ্রের ভোটার না হলে ইভিএম মেশিন তাও বলে দেয়। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এন্তাজ উদ্দীনও বিভিন্ন তথ্য জেনে এক গাল হেসে কেন্দ্র থেকে বের হলেন। নারী ভোটার ঝুমুর আক্তার ভোট দিলেন, আবার ভোট দিতে গেলে কি অবস্থা হয় তা জানার জন্য আবার ভোট দিতে গেলেন। তখন মনিটরে লেখা আসল-‘ঝুমুর আক্তার, আপনি ইতিপূর্বে ভোট প্রদান করেছেন।’
কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং অফিসার স্বপন কুমার মিস্ত্রি, পোলিং অফিসার আবুল হোসেন দৃঢ় গলায় জানালেন, এ মেশিনে ভোট কারচুপি করার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। এ মেশিনে এবারই প্রথম ভোট নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের পর বোঝা যাবে এ মেশিনের সফলতা।

তবে কেন্দ্রটিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, মেশিনে কারচুপির সুযোগ নেই। কে কোন প্রতীকে ভোট দেবেন তা গোপন কক্ষে বসে ভোটার ঠিক করবেন। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হলে কোনো অঘটন ঘটবে না। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে কোনো প্রার্থী বা দলের সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রতীকে চাপ দিতে বাধ্য করলে তখন তো আর কারও কিছু করার থাকবে না।

আপনার মন্তব্য লিখুন