সারাদেশে নৌকা-ধানের শীষের সরগরম প্রচারণা

বেরিয়ে আসছে মানুষ

48360955_815985655460102_1654105198336933888_n.jpg

দিসিএম ডেস্ক।।

নির্বাচনী প্রচারণায় সারাদেশ সরগরম। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা রাজসিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলাচ্ছেন। সাজানো মাঠে ইসি-প্রশাসনযন্ত্র অনুক‚লে থাকায় সারাদেশে মহাজোটের উৎসবমূখর প্রচারণা। সর্বত্রই ছেয়ে গেছে নৌকা প্রতীকের পোস্টার। অন্য দিকে, কদাচিৎ চোখে পড়ছে ধানের শীষ পোস্টার। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গঠনে ইসির ব্যর্থতায় প্রতিক‚ল অবস্থায় নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছে ধানের শীষের প্রার্থীরা হামলা-মামলা-গুলি-গ্রেফতারের মধ্যেই। ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকা মানুষ বেরিয়ে আসছে, পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষ্যে প্রচারণায় নামছে। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা বাড়ছে।
বিএনপি তথা (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) এখন মাঠে। ক্রমান্বয়ে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের প্রচারণায় আমজনতার সংখ্যা বাড়ছে। দেশের শিশু শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ/যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ’ সেøাগান গ্রহণ করেছে ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল হোসেনের দৃঢ় অঙ্গীকার ‘মরব তবু লড়ব’ শক্তি যুগিয়েছে।
সারাদেশে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা পদে পদে নানারকম বাধা অতিক্রম করে চালিয়ে যাচ্ছে প্রচার-প্রচারণা। পুলিশি নির্যাতনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল থেকে নানাভাবে উসকানি দেয়া হচ্ছে। পায়ে ঘাঁ দিয়ে ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টা চলছে। ভয়ভীতি দেখানো, ব্যানার-ফেস্টুন পুড়িয়ে দেয়া, হামলা এমন নানা কর্মকাÐ মাঠে ঘটছে। যাতে প্রতিবাদ করতে নেমে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ক্যাডার আর পুলিশের দৌড়ানি এবং মামলায় জড়িয়ে মাঠ ছেড়ে ফের ঘরে ঢুকে যায় বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থকরা। নানারকম বাধাবিঘœ আর নির্যাতন সয়ে ধৈর্য ধরে মাঠ কামড়ে পড়ে আছে ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপির লোকজন। শুরুতে ভয়ে প্রচার-প্রচারণায় গতিহারা হলেও ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রচার মিছিল থেকে বাড়ি বাড়ি প্রচার-প্রচারণায় কর্মী-সমর্থক বাড়ছে। দীর্ঘ দিন পর হলেও নেতাকে মাঠে পেয়ে সব ভয় ঝেড়ে ফেলে দুঃশাসন থেকে মুক্তির শেষ আশায় কর্মীরা মাঠে তৎপর। নেই কোনো বিরোধ। সবাই একাট্টা হচ্ছে। আর হারানোর কিছু নেই। সাধারণ সমর্থকরা যারা এতদিন বিএনপির নাম মুখে নিতে পারেননি, তারাও সরব হচ্ছেন। ক্ষমতাসীনদের দাপুটে প্রচার-প্রচারণার বিপরীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কৌশলী প্রচার চলছে। সারাদেশ থেকে আমাদের ব্যুরো ও আঞ্চলিক প্রধানরা জানিয়েছেন এমন চিত্র। তারা জানান, সর্বত্রই দাবি দ্রুত সেনা মোতায়েন করা হোক।
পাল্টে যাচ্ছে ঢাকার চিত্র
রাজধানী ঢাকার ২০টি আসন ও এর আশপাশের এলাকার ভোটের চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। মহাজোট প্রার্থীরা শুরু থেকেই মাঠ চষে বেড়ালেও ঐক্যফ্রন্ট তা বিএনপি প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মাঠে নামতে শুরু করেছেন। বিএনপির প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীরা জানান, রাজধানীসহ সারা দেশে গণসংযোগকালে অব্যাহতভাবে বাধার মুখে পড়ছেন বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীরা। বেশির ভাগ জায়গায় তারা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাধা ও হামলার মুখে পড়ছেন। কোনো কোনো জায়গায় সরাসরি বাধা দিচ্ছে পুলিশ। তারপরেও থেমে নেই নির্বাচনী প্রচারকাজ।
গত শনিবার প্রচারণা চালানোর সময় হামলার শিকার হন ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। গতকাল সোমবারও তিনি প্রচারণা চালিয়েছেন। গত শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট এলাকায় আনুষ্ঠানিক প্রচারণার আয়োজন করেছিলেন ঢাকা-১৩ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আবদুস সালাম। কিন্তু পুলিশের বাধায় তিনি সেটা করতে পারেননি। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। গতকালও প্রচারণা চালিয়েছেন। বৃহস্পতিবার প্রচারণাকালে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলার মুখে পড়েছিলেন ঢাকা-৯ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আফরোজা আব্বাস। গত শুক্রবারও তিনি মাদারটেক এলাকায় প্রচারণা শুরুর পর তার চারপাশে অবস্থান নেয় পুলিশ।
একপর্যায়ে পুলিশের বাধার কারণে তিনি ছাদখোলা গাড়িতে চড়ে প্রচারণা শুরু করেন। কিন্তু পুলিশের দুইটি গাড়ি আফরোজা আব্বাসের গাড়িকে কোথাও দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। একপর্যায়ে ছাত্রদল নেতা আক্তারকে গ্রেফতার করলে পুলিশের অতি তৎপরতার কারণে গণসংযোগ বন্ধ করে ফিরে যান আফরোজা আব্বাস। এতোকিছুর পরেও থেমে থাকেননি তিনি। নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ওয়ারীতে গণসংযোগকালে ঢাকা-৬ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। ওই দিন তিনি প্রচারণা বন্ধ করে ফিরে গেলেও পরদিন থেকে আবার মাঠে নেমেছেন। ঢাকা-১৪ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিকও ক্ষমতাসীনদের হামলার মুখে পড়েন। কিন্তু তারপরেও থেমে থাকেননি তিনি।
রাজধানীর উত্তরখানে ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থীর পক্ষে আনুষ্ঠানিক গণসংযোগের সূচনা করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না। দুদিন ধরে ওই এলাকায় রাতদিন গণসংযোগ করে চলেছেন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।
এদিকে, ঢাকা-৪ আসনে লাঙ্গলের প্রার্থী সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা সস্ত্রীক প্রচারনা চালালেও থেমে নেই বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনিও নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। সাথে নেতাকর্মীরাও উৎসাহ নিয়ে গনসংযোগ করছেন বলে জানান তার সহকারী। ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান মোল্লার গণসংযোগ চলছে মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই। নৌকার পোস্টারে ছেয়ে গেছে যাত্রাবাড়ী- ডেমরা এলাকা। ধানের শীষের পোস্টার না থাকলেও থেমে নেই এ আসনের বিএনপি প্রার্থী নবীউল্লাহ নবীর প্রচারণা। গত ১২ ডিসেম্বর থেকে তিনি আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামেন। মিছিল মিটিং করার সুযোগ না পেলেও গণসংযোগ করছেন তিনি। তার সাথে থাকছে হাজার হাজার নেতাকর্মী।
ঢাকা-১১ আসনে মহাজোটের প্রার্থী রহমত উল্লাহ। তার বিপরীতে আছেন বিএনপি নেতা কাইয়ুমের স্ত্রী শামীম আরা বেগম। রহমত উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। নৌকার পেস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। ধানের শীষের প্রার্থী শামীম আরাও নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের প্রার্থী আওয়ামী লীগের নায়ক ফারুক। অভিজাত এলাকায় তিনি কয়েক দিন আগে থেকেই প্রচারকাজ চালাচ্ছেন। তার বিপরীতে ঐক্যজোটের প্রার্থী আন্দালিব পার্থ। অনেকটা নির্জনে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে পার্থকে। তবে দিন দিন এ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে জানান গুলশানের এক বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে পার্থর সাথে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালও প্রচারণায় অংশ নেন। পুলিশের ভয়ে নেতাকর্মীরা পার্থর কাছে ভিড়তে ভয় পায়। তবে এ পরিস্থিতিরও উন্নতি হচ্ছে দিন দিন। ঢাকা-১৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. এনামুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ডা. দেওয়ান সালাহউদ্দিন। নৌকার পোস্টারে পুরো সাভার এলাকা ছয়ে গেছে অনেক আগেই। গত কয়েক দিন ধরে ধানের শীষের পোস্টারও দেখা যাচ্ছে এলাকায়। ধানের শীষের প্রার্থী প্রকাশ্যে মিটিং মিছিল করতে না পারলেও থেমে নেই এ আসনের প্রচারকাজ। সাধারণ মানুষ ঘরে ঘরে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে বলে জানান দেওয়ান সালাহউদ্দিনের একজন সমর্থক। তার মতে, মানুষ শুধু ভোট কেন্দ্রে যেতে পারলেই চলবে।
অন্যদিকে, ঢাকার পাশ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের সবকটি আসনে ভোটের হাওয়া লেগেছে। তবে এখনও নারায়নগঞ্জ-৪ আসনে প্রচারণা জমে উঠেনি। এই আসনে অনেক প্রার্থী থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীর প্র্রচারণা চোখে পড়েনি ভোটদের। সিদ্ধিরগঞ্জ- ফতুল্লা ও নারায়নগঞ্জ শহরের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৬লাখ ৫১হাজার ৯৯জন। বর্তমানে এ্ই আসনের সংসদ সদস্য আছেন একেএম শামীম ওসমান। তিনি এবারও আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। অপর দিকে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন ওলামে জমিয়াতুল ইসলামের জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন। ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মনির হোসাইনকে অনেকেই চিনেন না। তার সম্পর্কে মানুষের জানা নেই। এখন পর্যন্ত এ প্রার্থী তেমন গণসংযোগও করছেন না। নেই কোন নির্বাচনী ক্যাম্প। প্রার্থী কোথায় আছেন সেটাও অনেকে জানেন না। কোথায় কোন পোস্টারও নেই, নেই মাইকিংয়ের প্রচারণাও। অপর দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একেএম শামীম ওসমান তার নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন । প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে করছেন গণসংযোগ ও উঠোন ্ৈবঠক। দোয়া চেয়ে ভোট চাইচ্ছেন ঘরে ঘরে। দিচ্ছেণ না উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। ফলে ফুরফুরে মেজাজেই রয়েছে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা।
চট্টগ্রামে পুলিশি হয়রানির মধ্যেই প্রচারণা
শফিউল আলম চট্টগ্রাম ব্যুরো, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভোটের মাঠমুখী থাকার কঠোর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। প্রচার-গণসংযোগ, সভা-মিছিলে তৃণমূল নেতাকর্মী, সমর্থকদের অংশগ্রহণ প্রতিদিনই বেড়ে যাচ্ছে। ভোটারদের বাড়িঘরে যাচ্ছেন বিশেষ করে মহিলা ও তরুণ কর্মীরা। জনসমর্থন জোরদারের জন্য ছুটে যাচ্ছেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে। ‘দেশে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, শান্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৩০ ডিসেম্বর সবাই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালটের মাধ্যমেই গণরায়’ প্রদানের বার্তাটি ঘরে ঘরে পৌঁছাচ্ছেন তারা। বন্দরনগরী, জেলা চট্টগ্রাম ও তিনটি পার্বত্য জেলার ১৯টি আসনে বিএনপি জোটের পক্ষে প্রচার-গণসংযোগসহ নির্বাচনী তৎপরতা ক্রমেই চাঙ্গা হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চল এমনিতে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তির পুরনো শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই প্রেক্ষাপটে শাসক দল আ.লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের প্রার্থী, নেতাকর্মীরা অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ের প্রশ্নে দোটানায় রয়েছেন। গত ১২ ডিসেম্বর থেকে এ যাবৎ অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় প্রচার-গণসংযোগকালে বিএনপি জোটের প্রার্থী এবং নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর সশস্ত্র হামলা, ভোটের প্রচার থেকে বিরত রাখতে প্রতিনিয়ত হুমকি-ধামকির অভিযোগ আ.লীগের কর্মী-ক্যাডারদের বিরুদ্ধে। অথচ প্রশাসন নির্বিকার। অনেক ক্ষেত্রেই শাসকদলের পক্ষপাতদুষ্ট।
গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় র‌্যালিতে বক্তৃতাকালে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমানের সমাবেশে সশস্ত্র হামলা-গুলিবর্ষণ করা হয়। অন্য দিকে যখন তখন গ্রেফতার আতঙ্ক, গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চলছে পুলিশি হয়রানি। বিভিন্ন এলাকা থেকে গত দুই সপ্তাহে বিএনপি জোটের দেড়শ’রও বেশি নেতাকর্মীকে পুলিশ আটক করেছে। উচ্চ আদালতে জামিনপ্রাপ্ত নেতাকর্মীদেরও পুরনো বা গায়েবি মামলা-হুলিয়ার নামে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তবে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি হুমকি-ধামকি অতিক্রম করে ভোটের চ্যালেঞ্জে ময়দানে বলিষ্ঠ অবস্থান জানান দেয়ার চেষ্টা করছে চট্টগ্রামে বিএনপি জোট। অনেকেই একথা বলেছেন, গত ১০ বছরের আওয়ামী শাসনকালে অত্যাচার-নিপীড়নে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। হারানোর আর কী বাকি? এসপার-ওসপার ফায়সালা হবে এবার ভোটের ময়দানে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইতোমধ্যে বিভিন্ন নির্বিাচনী এলাকায় পুলিশি হয়রানি এবং আ.লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মী-ক্যাডারদের সন্ত্রাস, হামলায় দ্বিমুখী বৈরী অবস্থার মুখেও বিএনপি জোটের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা ভোটের ময়দানে চ্যালেঞ্জ নিয়েই কমবেশি তৎপর রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া), চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা), চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম-৩ (স›দ্বীপ), চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুÐ), চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী), চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ), চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) এবং পার্বত্য জেলার খাগড়াছড়ি আসন।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশের লক্ষ্যে গত সোমবার অঞ্চলের ১৬টি আসনের প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে মতবিনিময় করেন দুই রিটার্নিং অফিসার বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। সভায় অনেক প্রার্থীই তাদের এলাকায় আ.লীগের কর্মী-ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলা, ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি এবং এর পাশাপশি পুলিশি হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন। এর ফলে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশে অনিশ্চয়তা এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদানের জন্য ভোটকেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে ভয়ভীতি তৈরি হচ্ছে বলেও তারা প্রশাসনকে সতর্ক করে দেন।
যশোরে সাহসী হয়ে উঠছে ঐক্যফ্রন্টের কর্মীরা
যশোর ব্যুরো জানায়, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমে ৩৬টি আসনে এলাকার অধিকাংশেই ভোটের ময়দান ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। একের পর এক হামলা, মামলা, ভাঙচুর, প্রচারে বাধা এবং হুমকি-ধামকি চলছে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের। বিভিন্নস্থানে প্রতিরোধ গড়ে উঠা শুরু হয়েছে। এটি মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এ অঞ্চলের ভোটারদের ভেতরের খবরটা হচ্ছে, পরিবেশ পরিস্থিতি যাই হোক ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাবেন ভোটাররা। তাতে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের ঢল নামবে বলে আভাস পাওয়া গেছে। গোটা অঞ্চলে নির্বাচনের মাঠচিত্র হচ্ছে, সার্বিক পরিবেশ অশান্ত। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও কোথাও এখনই মুখোমুখি অবস্থানে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্ট। মাঠে নামতেও শুরু করেছে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। ২৪ তারিখে সেনাবাহিনী মাঠে নামলে ভোটের চিত্র পরিবর্তন হবে বলে আশাবাদ বিশ্লেষকদের। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এ অঞ্চলের বিরোধী নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা, গ্রেফতার সত্বেও কেউ ভোটের মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে না। পরিস্থিতি পরিবেশই তাদের প্রচন্ড সাহসী করে তুলেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্নস্থানে নেতাকর্মীদের ওপর হামলার পরও দৃঢ়তার সঙ্গে বক্তব্য দেয়া ও মাঠে থাকায় মাঠের নেতাকর্মীদের সাহস বাড়িয়ে তুলেছে বলে যশোর ও খুলনার বেশ কয়েকজন ঐক্যফ্রন্ট নেতা দৈনিক ইনকিলাবকে জানান।
যশোর-৩ (সদর) আসনের ধানের শীষে প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পরিষ্কার বলেছেন, হামলা ও হুমকিতে আমি ভয় পাই না, জনগণ আমার সাথে, শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের ময়দানে থাকব। কেশবপুরের ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ সম্মেলন করে বলেছেন, পুলিশি হয়রানি এবং সন্ত্রাসীদের হামলা-হুমকি উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। গত তিন দিনে এই অঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিত্র হচ্ছে- যশোরে ধানের শীষের গণসংযোগে বোমা হামলা, উল্টো আক্রান্তদের নামে মামলা, কলারোয়ায় ধনের শীষের প্রার্থীর ওপর হামলার পর উল্টো প্রার্থীর নামে মামলা, সাতক্ষীরায় ধানের শীষের প্রার্থী গ্রেফতার, চৌগাছায় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আটক, কালীগঞ্জে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী-কর্মীরা আক্রান্ত, যশোরের বাঘারপাড়ায় ধানের শীষের প্রার্থী টি এস আইয়ুবের বাড়িতে হামলা ও ধরপাকড়। এসবে দমাতে পারছে না ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী, দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের।
বরিশালে ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে মানুষ
বরিশাল ব্যুরো জানায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনী পরিবেশ এখনো বহু যোজন দূরে। এখনো দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি নির্বাচনী এলাকার বেশির ভাগেই একটি নিষ্কলুষ ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। এত দিন যে পুলিশ ও প্রশাসন সরকারি দলের সহায়ক ভ‚মিকায় ছিল, সেখান থেকে এখনো তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। বরিশাল-১ আসনে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী জহিরুদ্দিন স্বপন নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ থেকে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তাকে ও কর্মীদের বের হতেই দিচ্ছে না মহাজোটের কর্মীবাহিনী। গণসংযোগেও তার মিছিলে বাধা দেয়া হয়েছে। তার নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করতে গেলও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। অথচ তার বিরুদ্ধে পৌরমেয়র একটি মিথ্যা জিডি করলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেছেন। জহিরুদ্দিন স্বপন অভিযোগ করেন, নির্বাচনী এলাকার কোথাও তার পোস্টার পর্যন্ত লাগাতে দিচ্ছে না মহাজোটের কর্মীরা। যেসব পোস্টার লাগান হয়েছে, তা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। কোথাও তা আগুন দিয়ে পুড়িয়েও ফেলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এমনকি নির্বাচন কমিশন থেকে তার নিরাপত্তার জন্য বরিশালের এসপিকে নির্দেশ দেয়ার পরও তা আমলে নেয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী স্বপন।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি জেলারই একাধিক নির্বাচনী এলাকার চিত্রও কমবেশি প্রায় একই ধরনের। সার্বিক বিবেচনায় দক্ষিণাঞ্চলজুড়েই এখন পর্যন্ত মহাজোটের প্রার্থীরা একটি সুন্দর পরিবেশে নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এবং কর্মী সমর্থকগণই প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হয়ে আছে। অথচ এ অঞ্চলের ২১টি আসনেই ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থীরা এবার ব্যাপক প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন। এমনকি জোট শরিক জাতীয় পার্টিও মহাজোটের সিদ্ধান্তের বাইরে একাধিক আসনে অনেকটা বিদ্রোহীর ভ‚মিকায় নির্বাচন করছেন। তাদের প্রতি মহাজোটসহ পুলিশ প্রশাসনের মনোভাব এখনো যথেষ্ট সহনশীল।
বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলার ৬২ লাখ ২১ হাজার ১১০ জন ভোটার তাদের পছন্দের ২১ জন এমপি নির্বাচিত করার লক্ষ্যে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আকাক্সক্ষা পোষণ করছেন দীর্ঘ দিন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আর ভোট দিতে পারেননি। ওই জাতীয় নির্বাচনে দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি জেলার পাঁচটিতেই কোনো ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত নির্বাচন নিয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। ইতোমধ্যে অনেকেই আশাহত। সকলেই এখন সেনা বাহিনীর প্রতিক্ষায় সময় গুনছেন। ভোটের মাত্র ১১ দিন বাকি থাকলেও এখনো বেশ কয়েকটি এলাকায় সব প্রার্থী যেতেই পারেননি। অনেক এলাকার প্রার্থীরা নিজ গ্রামে ও বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহীতে পুলিশে আস্থা নেই ভোটারদের
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, আতঙ্ক আর ভয়কে জয় করে রাজশাহী অঞ্চলে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা। ক্ষমতাসীন দলের রাজসিক প্রচার-প্রচারণার পাশপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী, কর্মী-সমর্থকরা এখন মাঠে। পদে পদে বাধা ডিঙিয়ে এগুচ্ছেন। প্রত্যয় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার। নেতাকর্মীদের দেখে মাঠে আসেন দম বন্ধ করা অবস্থায় থাকা সমর্থকরা। ভারী হচ্ছে প্রচারণার মিছিল। সাধারণ মানুষ সাহস করে পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলতে শুরু করেছেন। তারা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। কিন্তু ভোটের আগে শেষ কামড় দেয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। সাধারণ মানুষ সেনা মোতায়েনে স্বস্তি খুঁজছেন। তারা আরো আগে সেনা মোতায়েনের দাবি করছেন। তাদের পুলিশের ওপর আস্থা কম। সেনা থাকলে মাঠ কিছুটা হলেও মসৃণ হবে। নাটোরে বেশির ভাগ যে সামান্য ব্যানার-ফেস্টুন রয়েছে, তা গায়েব হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি। বলার কিছু নেই। চলছে গ্রেফতার। বিভীষিকাময় অবস্থা। এর মধ্যেও কারারুদ্ধ স্বামী সাবেক মন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর স্ত্রী সাবিনা ধানের শীষের প্রতীক হাতে নিয়ে মাঠে। রাজশাহীর চারঘাটে কারাবন্দি আবু সাঈদ চাঁদ। তার পরিবার নেতাকর্মীরা প্রচার-প্রচারণা চালাতে বাধাগ্রস্ত হলেও বসে নেই। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর মতো পোস্টার-ব্যানার ছেড়ার উল্টো অভিযোগে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বিপক্ষে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। সর্বত্র ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে নিপীড়িতদের অবস্থান। এমনিতে তো দমন-নিপীড়নে আধমরা হয়ে আছে। তাই মরার আগে আরেকবার জ্বলে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে মাঠে সক্রিয় হয়েছেন সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। দিন দিন এদের সংখ্যা বাড়ছে। মহিলা কর্মীরাও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। নৌকার পাশাপাশি ধানের শীষের সেগানও ধ্বনিত হচ্ছে বেশ জোরেই।
দ্রæত সেনা চান বগুড়ার মানুষ
বগুড়া ব্যুরো জানায়, মনোনয়নপত্র দাখিল ও বাছাইপর্ব পর্যন্ত বগুড়ায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ভোটারদের মধ্যে যে লক্ষ্য করা যায়, ইদানীং তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী-প্রচারণা শুরুর পর থেকে বগুড়ায় এ পর্যন্ত তিনটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এই তিনটি হামলার ঘটনার পর বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টভুক্ত নেতাকর্মীরা তাদের প্রচারণা আরো জোরদার করেছে। তবে টেলিভিশন, পত্রিকা ও ফেসবুকসহ অন্যান্য মিডিয়ায় সারাদেশে হামলার ঘটনাবলি দেখে বগুড়ার ভোটারদের মধ্যে ভোট সম্পর্কে কিছুটা হতাশার ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই মিডিয়া কর্মঅদের কাছে জানতে চাইছেন, ভাই শেষ পর্যন্ত ভোট হবে তো? আবার ভোট যদি হয়, তা হলে নিজের ভোটটা দিতে পারব তো? বগুড়া বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরা দাবি করছেন, অবিলম্বে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হোক।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, জনগণ বিশ্বাস করে- ভোটের মাঠে সেনাবাহিনী থাকলে সন্ত্রাসীরা ভয় পেয়ে গর্তে লুকাবে। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরে আসবে।
এখনো ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে খুলনায়
খুলনা ব্যুরো জানায়, নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের ১৪টি আসনে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠ দখলে এগিয়ে চলেছেন। বিএনপির প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা-মামলা বাড়লেও তাদের মনোবল বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষমতাসীনরা ধানের শীষের প্রচারণা কাজে বাধাবিঘœ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছে। হুমকি দিচ্ছে, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। যে কারণে ভোটারদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও বিরোধী শিবিরের প্রার্থীরা ভোটের মাঠ দখলের প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধানের শীষ প্রতীকের কর্মীদের বাধা প্রদান, মারপিট, পোস্টার কেড়ে নেয়া, ছিঁড়ে ফেলা, ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়াসহ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মিলছে না বলে তাদের অভিযোগ।
খুলনাঞ্চলের ১৪টি আসনের অধিকাংশ আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা প্রতিনিয়িত হামলা মামলার শিকার হচ্ছেন। তবুও থেমে নেই তাদের প্রচারণা। হামলা-মামলা উপেক্ষা করে দিন-রাত ছুটছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। মনোবল হারাচ্ছেন না তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা। হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে নেতাকর্মীদের নির্বাচনমুখী চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন খুলনা বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তারা জানান, বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন আর হামলা-মামলার ভয়ে ভীত নয়। যে কোনো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সফলের জন্য খুলনাঞ্চলের বিএনপির প্রার্থী ও কর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।
খুলনা-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘প্রায় এক যুগ বিএনপি নেতাকর্মীরা হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত। তার ওপর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, বাড়িতে গ্রেফতার-তল্লাশির নামে হয়রানি করেছে পুলিশ। স্বৈরাচারের সব ঘৃণ্য রেকর্ড ভঙ্গ হয়ে গেছে বহু আগে। একদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে ভোট চাইছে ওরা, অন্য দিকে পুলিশের সহযোগিতায় মামলা ও হামলা চালানো হচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর। বিএনপি ও জামায়াত অধ্যুষিত বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে গত চার দিনের হামলা ও ভোটের মাঠ থেকে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের বিতাড়িত করার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে, তা ন্যক্কারজনক ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
সিলেটে সুবাতাস নিয়ে শঙ্কা
সিলেট ব্যুরো থেকে ফয়সাল আমীন জানান, আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্নি মাটি সিলেট। এখানকার মাটির আন্দোলনের ঢেউ উঠে দেশব্যাপী। শাবি নামকরণবিরোধী আন্দোলনে এ মাটি কেঁপেছে শাসকশক্তি তৎকালীন আ.লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে এ মাটিতে চারদলীয় জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনের গতি বেগবান হয়েছে দেশময়। এ মাটিতে প্রধান রাজনীতিক দলসমূহ ছাড়াও আঞ্চলিক ইসলামিক রাজনীতিক দলগুলোও শক্তিশালী। ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে তারা ভ‚মিকা রাখে আপসহীন। শাসক দল আ.লীগের চেয়ে বিএনপি-জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি ও সমর্থন ব্যাপক। তারা বরাবরই দাপুটে ছিল রাজপথে। কিন্তু বর্তমান আ.লীগ সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলনেই সুবিধা করতে পারছে না তারা। মাঠে নামার চেষ্টা করেও পরিচয় দিয়েছে ব্যর্থতার। তাদের ব্যর্থতা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণও ছিল। পূর্বেকার আন্দোলন-সংগ্রামে মুখোমুখি হতো রাজনীতি শক্তিগুলো। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী রাজনীতিক দলগুলোর মধ্যেই চলত লড়াই। উভয়ে ধারস্ত হতো প্রশাসনের। সরকারে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রশাসন তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ আচরণে সংগঠিত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সেদিন এখন বদলে গেছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামলে খোদ পুলিশই মুখোমুখি হয়ে যায় বিরোধী রাজনীতিক দলসমূহের। প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার কম চেষ্টা করেনি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু পরিণামে মামলার পাহাড়ে চাপা পড়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের সকল সম্ভাবনা। তবে নির্বাচন ইস্যুতে অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যফ্রন্টের কর্মী-সমর্থকরা মাঠে নামতে শুরু করেছেন।
আ.লীগের কর্মী-সমর্থকরা শক্তি সঞ্চয় করে বসে আছে বিজয়ের আত্মবিশ্বাসে। তাদের গতিবিধিতে নেই কোনো ধরাবাঁধা। তবে বাকি আইন-নিয়ম সবই একমাত্র ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ওপর সক্রিয়। সিলেটের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে শাসক দল আ.লীগ। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রে একক নিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে সেই সক্রিয় নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করে দেয়া হবে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছে ইতোমধ্যে স্থানীয় বিরোধী নেতাকর্মীরা। তাই বলে পিছু হঠেনি এখনো তারা। গাঁ-বাঁচিয়ে নীরবে চলার চেষ্টায় নির্বাচনের দিন গণনা শুরু করে দিয়েছে। তাদের এ নীরব ভ‚মিকা নিয়ে শঙ্কিতও শাসক দলের নেতাকর্মীরা। শাসকদলের সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের সকল উসকানি দাঁত কামড়ে মানিয়ে নিতে চাইছে। তারা চাচ্ছে না তাদের জানাতে, প্রশাসন দিয়ে শক্তি ক্ষয়ে মরিয়া হয়ে উঠুক শাসক দল। চলমান এ অপ্রত্যাশিত ভোট রাজনীতির মাঠে শাসক দলের একতরফা সরবে তারাও মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবে, এমনটিই মনে করছেন অনেকে। সে কারণে সময়ের সাথে সাথে শঙ্কাও বাড়ছে, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা, শাসকদলকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ধারাবাহিক হামলা-মামলা-হয়রানিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নেতাকর্মীদের মন-মস্তিষ্কে আগুনে ক্ষোভ কোথায় গিয়ে আঘাত করে, তা নিয়ে এখন জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সে কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্নি মাটি সিলেট এই নির্বাচনের প্রশ্নবিব্ধ ঘটনা সমূহ কারণে হয়তো পুনরায় স্বরূপে ফিরে আসবে।
ময়মনসিংহে হামালা-মামলায় গণসংযোগ
বিশেষ সংবাদদাতা : ময়মনসিংহে ১১টি সংসদীয় আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও কর্মী সমর্থকরা ক্ষমতাসীনদের হামলা-মামলা উপেক্ষা করেই গণসংযোগে মাঠে রয়েছেন। এ ঘটনায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও থানা পুলিশে অভিযোগ হলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও সমর্থকরা। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ধানে শীষের প্রচারণায় বাধা দিয়ে মাইক ও অন্যান্য সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের ঘটনায় শনিবার দুপুরে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা করিমের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয় বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসাইনের পক্ষে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নৌকা প্রতীকের প্রচার মিছিলে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ আসনের মহাজোট প্রার্থী কে এম খালিদ বাবু বলেন, বিএনপি জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসীরা আমার কর্মীদের ওপর হামলা করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুল ফরাজী বলেন, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মী-সমর্থকরা আমাদের নামে অপপ্রচার করছে। মুক্তাগাছা আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ জাকির হোসেন বাবলু জানান, ১১ ডিসেম্বর বিকেলে গণসংযোগকালে উপজেলার কুমারগাতা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে আ.লীগ অতর্কিত হামলা চালিয়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এতে আমি ও ড্রাইভার আব্দুল্লাহ আহত হই। অপর দিকে, একই দিনে ভালুকা উপজেলার বাটাজোড় বাজার এলাকায় বিএনপির প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চুর নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা করে ভাঙচুর করেছে আ.লীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় নির্বাচনী কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিল-টিভি ও আলমিরা ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়াও জেলার ফুলপুর উপজেলার বাসস্ট্যান্ড এলাকা মঙ্গলবার বিকেলে ধানের শীষ ও নৌকা সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
প্রচার-প্রচারণায় নিরাপত্তা চান বিএনপি প্রার্থীরা
নোয়াখালী ব্যুরো জানায়, জেলার ছয়টি আসনে বিএনপির ভিআইপি প্রার্থীর ছড়াছড়ি। নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ি একাংশ) বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি একাংশ) বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চারবারের সাবেক এমপি জয়নুল আবদীন ফারুক, নোয়াখালী-২ (বেগমগঞ্জ) সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, নোয়াখালী-৪ (সদর-সূবর্ণচর) বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, তৃণমূল সমন্বয়ক ও পাঁচবারের সাবেক এমপি মোহাম্মদ শাহজাহান, নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে বিজিএমইএ’র প্রতিষ্ঠাতা ফাস্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হাতিয়ার আসনে তিনবারের সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজিম।
দলীয় প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে হামলা-মামলার শিকার হন বিএনপি প্রার্থী ও প্রচারকর্মীরা। এর মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সমর্থনে কবিরহাট বাজারের জিরোপয়েন্টে পূর্ব নির্ধারিত পথসভায় ভন্ডুল করে দেয় নৌকা মার্কার সমর্থকরা। হামলায় ৩০ জন আহত হওয়া ছাড়াও বিএনপি সমর্থিত বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে হামলা চালানো হয়। কবিরহাটে ওই নির্বাচনী আসনে প্রচার-প্রচারণা নেই বলে অভিযোগ করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
গত রোববার বিজয়

আপনার মন্তব্য লিখুন