বিশ্ব সেরা উচ্চতা নিয়ে অস্বস্তিতে জিন্নাত,এখন হাসপাতালে

Screenshot_2018-10-24-22-36-56-441_com.android.chrome.jpg
দাবি করা হচ্ছে জিন্নাত আলীর উচ্চতা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি। তিনি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন। 

কমল জোহা খান, ঢাকা

বুধবার বেলা একটা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ডি ব্লকের ১৭ তলায় এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ড। ট্রলিতে রোগীদের জন্য খাবার পরিবেশন করছিলেন হাসপাতালের এক নারী কর্মী। ১৭ নম্বর বেডের সামনে আসতেই ট্রলি থেকে খাবার-ভর্তি তিনটি ট্রে বের করলেন। প্রতিটি ট্রেতে ছিল ভাত, এক টুকরো মাছ আর পাতলা ডাল। পাশের ওয়ার্ড থেকে অন্য রোগীদের এক স্বজনও আরেকটি ট্রেতে করে খাবার দিয়ে গেলেন । এত খাবারেও নাকি জিন্নাত আলী নামের ওই রোগীর জন্য যথেষ্ট নয়। তবু চার প্লেট ভাত, চার টুকরো মাছ আর ডালে ‘অর্ধাহারে’ থাকতে হয় ২২ বছর বয়সী দীর্ঘদেহী এই যুবককে।

এর কারণ জানা গেল জিন্নাত আলীর বড় ভাই মো. ইলিয়াস আলীর কাছ থেকে। তাঁর দাবি, জিন্নাতের উচ্চতা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি! দেশের সবচেয়ে দীর্ঘকায় মানুষ। ভাইয়ের এই উচ্চতার জন্য তিনি গর্বিত নন, বরং অভাব ও দারিদ্র্যের কারণ বলে মনে করেন।

হাসপাতালের নথিতে অবশ্য জিন্নাতের উচ্চতা ৭ ফুট ৬ ইঞ্চি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, জটিলতার কারণে জিন্নাতের উচ্চতা পুরোপুরি সঠিকভাবে মাপা সম্ভব হয়নি।

দাবি করা হচ্ছে জিন্নাত আলীর উচ্চতা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি। জিন্নাত আলী এখন অসুস্থ। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালামদাবি করা হচ্ছে জিন্নাত আলীর উচ্চতা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি। জিন্নাত আলী এখন অসুস্থ। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালাম

ইলিয়াস আলী প্রথম আলোকে বলেন, জিন্নাতের প্রচুর খাবার প্রয়োজন হয়। তাঁকে বাড়িতে সকাল, দুপুর ও রাতের বেলা ভাত দিতে হয়। প্রতিবেলায় এক কেজি চালের ভাত, আর প্রচুর পরিমাণে তরকারি লাগে। কিন্তু আমরা দিতে পারি না।

ইলিয়াস আলী জানান, কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া বড়বিল গ্রামের তাঁদের বাড়ি। বৃদ্ধ বাবা আমীর হামজার এক মেয়ে, তিন ছেলের মধ্যে জিন্নাত তৃতীয়। অন্য সবার মতো স্বাভাবিক ছিল জিন্নাতের গড়ন। কিন্তু ওর বয়স যখন ১২ বছর, সে সময় থেকেই দ্রুত উচ্চতা বাড়তে থাকে। প্রতিবছর দুই থেকে তিন ইঞ্চি করে আকৃতি বাড়তে থাকে। ১০ বছরের মধ্যে প্রায় চার ফুট উচ্চতা বেড়ে জিন্নাত এখন ৮ ফুট ২ ইঞ্চির এক মানব।

তবে আশপাশের বেশির ভাগ মানুষ জিন্নাতকে ‘মানুষ’ ভাবে না, ভাবে ‘জন্তু’।—এমন কথাই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান ইলিয়াস আলী। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ঘর থেকেই বাইর হয় না। বাইরে গেলে লোকে খ্যাপায়, খোঁচা দেয়। অনেক দিন পর এবার দুর্গাপূজার দশমীর দিন ভাইরে লইয়া বাইরে যাই। কিন্তু লোকজন ওর দিকেই তাকাইয়া থাকে। এমন কইরা কথা কয়, ঠাট্টা করে যে মনে হয় আমার ভাই জন্তু-জানোয়ার।’

জিন্নাত আলীর শারীরিক সমস্যার আসল কারণ এখন পর্যন্ত তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেননি। কক্সবাজার, ঢাকায় বহুবার চিকিৎসা করানোর পরও সুফল মেলেনি। ইলিয়াস আলী বলেন, ছয় বছর আগে পিজি হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) আনা হয়েছিল। তখন বলা হয়, অপারেশন লাগবে। ১২ লাখ টাকা খরচ হবে। অপারেশন না করালে ছয় মাসের বেশি বাঁচবে না। ডাক্তারের কাছে এ কথা শুনে আমি ভাইটারে বাড়ি নিয়ে যাই। কিন্তু ছয় বছর ধরে আমার ভাই তো বাইচ্চা আছে।

দুপুরে খাবার খাচ্ছেন জিন্নাত আলী। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালামদুপুরে খাবার খাচ্ছেন জিন্নাত আলী। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালাম

এবার ঢাকায় কেন আনা হয়েছে? জবাবে ইলিয়াস বলেন, ডান পায়ের চেয়ে জিন্নাতের বাঁ পা একটু বেশি লম্বা। এই পায়ের গোড়ালি ফুলে গেছে। পায়ে পানি জমে যাচ্ছে। ব্যথা করে। আমাদের এলাকার এমপি সাহেব (সাইমুম সরওয়ার কমল) এই হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। ঢাকায় আনতেও কষ্ট করতে হয়েছে। ১২৬ কেজি ওজনের জিন্নাতকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা যায় না। চেয়ারকোচে করে আনতে হয়েছে। বাসে তোলার সময় শরীরে ব্যথা লেগেছে।

ঢাকায় আনার পরও একই বিড়ম্বনা পিছু নিয়েছে জিন্নাতের। দাঁড়ালে লোকজন হাসিঠাট্টা করতে থাকে। তাই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকেন জিন্নাত। তবে ছয় ফুট লম্বা বিছানায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তিনি। দুই পা-হাত গুটিয়েই রাখতে হয় তাঁকে সব সময়।

হাসপাতালে অচেনা কাউকে দেখলেই চোখ বন্ধ করে দেন জিন্নাত। এর সঙ্গে হাত দিয়ে কপাল ঢেকে দেন তিনি। কেবল চিকিৎসক এলে কিছুটা কথা বলেন তিনি।

তাঁর শরীরের তুলনায় ছোট হাসপাতালের খাট। তাই গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকতে হয় তাঁকে। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালামতাঁর শরীরের তুলনায় ছোট হাসপাতালের খাট। তাই গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকতে হয় তাঁকে। বিএসএমএমইউ, ঢাকা, ২৪ অক্টোবর। ছবি: আবদুস সালাম

বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, জিন্নাতের মস্তিষ্কে টিউমার রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ ছাড়া হরমোন সমস্যার কারণে ওর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও পরীক্ষা করাতে হবে। জিন্নাতের মতো সমস্যা নিয়ে কয়েকজন রোগী এসেছিল। তবে এই ছেলের মতো দীর্ঘদেহী কেউই ছিল না। বাংলাদেশে জিন্নাতই সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ উচ্চতার মানুষ।

এ কথা শুনে জিন্নাতের ভাই ইলিয়াস বলেন, ‘আমার সংসারে আমি ধান কাটার কাজ করি। প্রতিদিন তিন শ টাকা আয় করি। ছোট ভাইরে খাওন দিতে পারি না। ওর জন্য প্রতিদিন চার কেজি চাল কিনতে হয়। তাই আমার সংসারও চলে না। অভাবে আমার বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে।’

এদিকে দুপুরের খাবার খেয়ে উঠে দাঁড়ালে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন জিন্নাতের দিকে। তখন কিছুটা রেগে তিনি বলেন, ‘আমার পায়ে খুব ব্যথা। হাঁটতে পারি না। খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনারা ছবি তুলবেন, আসেন আসেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন