দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন সম্প্রসারণে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি পূরণে নতুন বন সৃষ্টির দাবি

Presentation1-5.jpg

প্রেস বিজ্ঞপ্তি :
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেললাইন সম্প্রসারণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি পূরণে নতুন বনসৃষ্টির দাবি উঠেছে। কক্সবাজার জলবায়ু ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার অঞ্চলে নতুন বন সৃষ্টির পরিকল্পনা তৈরির দাবি জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবে উক্ত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার জেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। জেলা জলবায়ু ফোরাম, কোস্ট ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত ‘জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা অর্জন কৌশল’ ঈষরসধঃব ঋরহধহপব ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু গবপযধহরংস (ঈঋঞগ) প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় কক্সবাজার অঞ্চলে বনাঞ্চল হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা জলবায়ু ফোরামের দাবি সমূহ সংবাদ কর্মীদের সামনে তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে বক্তব্য রাখেন, কোস্ট ট্রাস্ট’র সহকারী পরিচালক মকবুল আহমেদ, সদর উপজেলা জলবায়ু ফোরামের সেক্রেটারী অধ্যাপক রোমেনা আকতার, সদস্য যথাক্রমে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুছ, রুহুল কাদের বাবুল, মিজানুর রহমান বাহাদুর, ইলিয়াছ মিয়া প্রমূখ।
মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম রাষ্ট্রপুঞ্জের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর বরাত দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র পুঞ্জের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) উষ্ণায়নজাত বিপদের যে আভাস দিয়েছে, যে হারে বাড়ছে বা ইতিমধ্যেই বেড়ে গিয়েছে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা, তাতে সমূহ বিপদ আমাদের অপেক্ষায়। সামগ্রিকভাবে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা গত দেড়শো বছরের তুলনায় ১ ডিগ্রি বেড়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। অবিলম্বে পৃথিবীকে কার্বন নিরপেক্ষ করে তোলার দিকে অগ্রসর হতে না পারলে আগামী এক দশক বা তার একটু বেশি সময়ের মধ্যেই আরও অনেকটা বেড়ে যাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা, রিপোর্ট তেমনই বলছে। কার্বনডাই অক্সাইড এবং কার্বন মনোঅক্সাইড নির্গত হয়ে পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়লে তা পৃথিবীর তাপকে ধরে রাখে। যার ফলে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পৃথিবীর নিম্নাংশ প্লাবিত হতে পারে। একেই বলা হচ্ছে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া।
আইপিসিসি-ও বরাত দিয়ে তিনি বলেন, বরফ গলে সমুদ্র্রে জলস্তর বেশ খানিকটা বেড়ে যেতে পারে এবং তাতে অনেক দ্বীপরাষ্ট্র ডুবে যেতে পারে। উপকূলীয় এবং উপকূলের নিকটবর্তী এলাকা গুলোও জলমগ্ন হয়ে পড়তে পারে। বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিটে মাটি হীন-উদ্বাস্তু হয়ে পড়তে পারেন, পৃথিবীর নানা অংশে তাপ প্রবাহ শুরু হতে পারে, একের পর এক ঝড় আঘাত হানতে পারে। যে হারে কার্বনডাই-অক্সাইডের নির্গমন ঘটছে, এই মুহূর্তে রাশটানা না গেলে ২০৩০ সাল নাগাদই পৃথিবীর সামনে ভয়াবহ বিপদ। নিস্তার পাওয়ার একমাত্র পথ কার্বন নির্গমন কমানো। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বিপদের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিতে না চাইলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হতে হবে এ গ্রহকে। পৃথিবীর জিডিপির আড়াই শতাংশ অর্থ প্রতি বছর বিনিয়োগ করতে হবে শক্তি ক্ষেত্রে। অথবা গাছ লাগাতে হবে বিপুল সংখ্যায়, সবুজ রঙে মুড়ে ফেলতে হবে পৃথিবীকে।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মুহম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও বিপদাপন্ন জনসাধারণের সুরক্ষা এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে চূড়ান্ত জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সর্বপ্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নেয় যা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের ধারণা, প্রস্তুতি ও অবস্থানের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
কক্সবাজার অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান হারে বন হ্রাসের প্রসঙ্গে ফোরাম সভাপতি মুহম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ বিপদাপন্ন দেশগুলোর অন্যতম হিশেবে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং দেশের মধ্যে কক্সবাজার জেলা উপকূলীয় জেলা হিসেবে অধিক বিপদের মুখোমুখি। এই অবস্থায় কক্সবাজার জেলায় রাহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প স্থাপনে ও কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের ফলে ব্যাপক বনভূমি ধ্বংস হয়েছে এবং হতে চলেছে। যেখানে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা রয়েছে বন রক্ষার ও আরো পুর্ন নবানয়নের; সেক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান হারে বনের হ্রাস পেতে চলেছে।
ফোরাম সভাপতি জলবায়ু ফোরামের পক্ষ থেকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নি¤œলিখিত দাবিসমূহ তুলে ধরেন, কক্সবাজার জেলার অনেক বনাঞ্চল ডিসি (ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার) খতিয়ানভুক্ত বা ১নং খতিয়ানভুক্ত। উক্ত বনাঞ্চল অনেক ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তির নামে বন্দোবস্তি নিয়ে নেয় এবং বনের ক্ষতি করে বসতি স্থাপন ও অন্যান্য স্থাপনা তৈরি করে থাকে। এতে বনের প্রভূত ক্ষতি হয়। তাই উক্ত ডিসি খতিয়ান ভুক্ত বনাঞ্চল বন বিভাগের খতিয়ানে স্থানান্তর করা আবশ্যক বলে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণ মনে করেন।
জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, ইকোপার্ক, সাফারীপার্ক প্রভৃতি এলাকায় অবৈধভাবে বসবাসকারীদেরকে অন্যত্র কোনো সুনির্দিষ্ট নির্বাচিত এলাকায় পুনর্বাসন করা হোক।
ফাঁসিয়াখালী, রিংবং প্রভৃতি বনাঞ্চলে অনেক অবৈধ বসবাসকারী পরিবার রয়েছে। রেললাইন সম্প্রসারণের ফলে তাদের মধ্যে ১৫০/২০০ পরিবার উচ্ছেদ হবে। তাদেরকে সুনির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন না করলে উচ্ছেদ হওয়া পরিবার সমূহ ক্ষতিপূরণ পেয়ে আবার অবৈধভাবে বনাঞ্চল দখল করবে এবং বনের ক্ষতি করবে। তাই তাদেরকে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্বাচিত স্থানে উচ্ছেদ হওয়া পরিবার সমূহকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পুনরায় বনাঞ্চল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবে।
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেললাইন সম্প্রসারণের দাবি এই অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের একটি অন্যতম দাবি। সরকারের উদ্যোগে তা পূরণ হতে চলেছে। এতে পর্যটন শহর কক্সবাজারের গুরুত্ব অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সাথে দেশের বিপুল পরিমান বনভূমির সম্পদের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে দেখলে এই ক্ষতি অপূরণীয়। তাই আমরা সরকারের নিকট দাবি তুলছি এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত বনের অন্তত পাঁচ গুণ নতুন বন সৃজন করা আবশ্যক। সরকার যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলার নিমিত্ত উক্ত প্রস্তাবিত বন সৃজন অতি প্রয়োজন।

আপনার মন্তব্য লিখুন