দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেল প্রকল্প: সেতুর নকশা নিয়ে জটিলতা

1598032030_14.jpg

দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেল প্রকল্প : ৪১ শতাংশ কাজ শেষ : ঝুলে যেতে পারে বিদেশী অর্থায়ন

দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের দোহাজারী-কক্সবাজার অংশের ৪১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে বাকি কাজ। কিন্তু রেললাইন নির্মাণকাজ শেষ হলেও বাধ সেধেছে কালুরঘাট সেতুর নকশা জটিলতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুটির উচ্চতা নিয়ে আপত্তি তুলেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিøউটিএ)। তাদের এ আপত্তির কারণে সেতুর নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। এতে করে রেললাইন নির্মাণ শেষেও ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। একই সাথে ঝুলে যেতে পারে প্রকল্পের বিদেশি অর্থায়নও।

সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেলপথ নির্মাণ। রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার সীমান্তের ঘুনধুম পর্যন্ত আরও ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। দীর্ঘ সমীক্ষা শেষে ২০১০ সালে এই নতুন রেলপথ স্থাপনের জন্য সরকার ওই বছরের ৬ জুলাই প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন দেয়। এরপর ২০২১ সালের ১৯ জুলাই প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদিত হয়। ওই সময়ই প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকাল জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত স্থির করে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রকল্পটি ফাস্ট ট্র্যাকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল। তবে প্রথম দফায় এই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ হবে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। রামু থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ আপাতত হবে না। এটা হবে দ্বিতীয় ধাপে। সরকারের নিজস্ব এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে এডিবির ১৫০ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজার চৌধুরীপাড়ায় দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং রামু-ঘুনধুম সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু তহবিলের সংস্থান না হওয়ায় প্রায় ৭ বছরেও সরকার জমি অধিগ্রহণ ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি ছিল না। এ অবস্থায় এগিয়ে আসে এডিবি। তাদের সঙ্গে সরকারের প্রথম দফা ঋণচুক্তি হয় ২০১৭ সালের ২১ জুন। আর দ্বিতীয় দফায় আরেকটি চুক্তি হয় ২০১৯ সালের ২৩ মে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়ার পরই আটঘাট বেঁধে নির্মাণকাজে নামে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ে। দুই লটে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
২০১৮ সালের মার্চ ও ১ জুলাই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করে। এই রেলপথ যাবে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, রামু ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ওপর দিয়ে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার মূল রেললাইন এবং ৩৯ দশমিক ২ কিলোমিটার লুপ লাইনসহ ১৪০ কিলোমিটার নতুন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। এই পথে থাকবে ৩৯টি মেজর ব্রিজ এবং ১৪৫টি মাইনর ব্রিজ ও কালভার্ট। বিভিন্ন শ্রেণির ৯৬টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হচ্ছে। হাতি চলাচলের যেসব পথ রয়েছে সেগুলোর জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে আন্ডারপাস ও ওভারপাস। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত থাকবে নতুন স্টেশন দোহাজারী, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজারে। রামুতে হবে জংশন। আর কক্সবাজারের রেলস্টেশনে নির্মাণ করা হবে আইকনিক ইন্টারমডেল টার্মিনাল বিল্ডিং। স্টেশনটি হবে ঝিনুক আকৃতির।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রজেক্ট প্রিপারেটরি ফ্যাসিলিটি প্রকল্পের অধীনে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ডুয়াল গেজ রেলপথ সংস্কারসহ আটটি প্যাকেজের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের অধীনে কালুরঘাটে অবস্থিত পুরনো রেল সেতুর স্থলে নতুন ‘রেলওয়ে কাম রোড সেতু’ নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে রোড কাম রেল সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হলে পুরনো নকশায় সেতু নির্মাণে কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। প্রস্তাবিত নকশায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ মিটার, যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিআইডবিøউটিএ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার করার শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। এতে সেতুর বর্তমান নকশা নিয়ে জটিলতায় পড়েছে রেলওয়ের সেতু বিভাগ।

সূত্র জানায়, স¤প্রতি সেতুটির নকশা পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে রেলওয়েকে একটি চিঠি দেয় প্রকল্পে অর্থায়নকারী দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রয়ত্ত দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)। গত ১০ জুন ইডিসিএফের সিনিয়র লোন অফিসার ইয়েলি কিম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে রেলওয়ে কাম রোড ব্রিজ অথবা শুধু রেল সেতু নির্মাণের বিষয়ে রেলওয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়।

পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড সর্বনি¤œ নেভিগেশনাল ছাড়পত্র কত হবে, সিঙ্গেল নাকি ডাবল রেললাইন, লেন সংখ্যা, সেতুর টাইপ (এক্সট্রা ডোজড/ট্রাস), রেলওয়ে গেজ (সিঙ্গেল/ডাবল), ব্রড গেজ বা মিটার গেজ এবং প্রকল্পের সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয় সম্পর্কে ক‚টনৈতিক চ্যানেলে বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। ইডিসিএফের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ইডিসিএলের কাছে ফিরতি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিআইডবিøউটিএ কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স হিসেবে সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু রেলওয়ে বিষয়টি দ্রæত সমাধানের চেষ্টা করছে। বিআইডবিøউটিএর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উচ্চতা আরো কমিয়ে আনতেও প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে ক‚টনৈতিক মাধ্যমে কোরীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন করে অর্থায়ন প্রস্তাবের অনুরোধ জানানো হয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বিআইডবিøউটিএ থেকে সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধির নির্দেশনার পর রেলওয়ে বিষয়টি দ্রæত সময়ের মধ্যে সুরাহা করতে বৈঠক করে। বৈঠকে বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শনে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আই) ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারকে প্রধান করে গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর বিআইডবিøউটিএ-এর প্রস্তাবকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে আরেক দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের চিন্তাভাবনা করছে রেলওয়ে। কেননা বর্তমান নকশায় ৭ দশমিক ২ মিটার উচ্চতার সেতুর পরিবর্তে উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার করা হলে সেতুর দৈর্ঘ্য, নির্মাণ ব্যয় ও সময় বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থায়ন জটিলতা ছাড়াও দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষেও কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন পরিচালনা বিঘিœত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় আগের নকশা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতার আশঙ্কা করছেন রেলওয়ের সেতু বিভাগ। এ প্রসঙ্গে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, নির্ধারিত সময়ের কিছুটা বিলম্বে কাজ শুরু হলেও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে ৪১ শতাংশ কাজ শেষও হয়েছে। আশা করছি ২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। এ সময়ের মধ্যে নতুন সেতু নির্মাণ শেষ হবে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে বিষয়টির সঙ্গে রেলপথ নির্মাণ কাজের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটির নকশাগত সমস্যা সমাধান হলে নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রস্তুত করতে এক বছর সময় লাগবে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে সেটি শেষ হতেও সময় লাগবে আরো দুই বছর। সব মিলিয়ে চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে। এর মধ্যেই দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে। এতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পটির কাজ শেষেও শুধু সেতু নিয়ে অনিশ্চয়তায় ঢাকা-কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না। তাছাড়া বর্তমানে স্বল্প পরিসরে ছোট ইঞ্জিন ও চার-পাঁচটি কোচ দিয়ে ট্রেন চালানো হলেও এর চেয়ে বেশি কোচ দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন সার্ভিসও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সেতুটির উচ্চতা নিয়ে বিআইডবিøউটিএ আপত্তি জানিয়েছে। আমরা এরই মধ্যে বিআইডবিøউটিএর সঙ্গে বৈঠক করেছি। উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে রেলওয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন জমা দিলে বিআইডবিøউটিএর সঙ্গে বসে বিষয়টি সুরাহা করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন