তিন দালালের হাত ধরে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টায় রোহিঙ্গারা

.jpg

সৈয়দুল কাদের :
কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল এলাকার রুহুল্লার ডেইল গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা সুলতান। ইয়াসমিন নামে একটি মেয়ে রয়েছে তার। চলতি বছরে শুরুতে হঠাৎ করেই তার কাছে এক রোহিঙ্গা মৌলভী এসে বলেন, এক রোহিঙ্গা নারীর নাম ইয়াসমিন। সে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে যেতে চায়। তোমার মেয়ের নামওতো ইয়াসমিন। এখানে শুধু ছবি পরিবর্তন করে দিলেই পাসপোর্ট করতে পারবে সে। এর বিনিময়ে তুমি অনেক টাকা পাবে। টাকার কথা শুনেই লোভে পড়ে যান সুলতান। ওই রোহিঙ্গা নারীর ছবি দিয়ে শুরু করেন পাসপোর্ট তৈরির সব কার্যক্রম।
সব শেষ ধাপ পুলিশ ভ্যারিফিকেশনে তাকে ডাকা হলে সঙ্গে নেননি ইয়াসমিনকে। ইয়াসমিন কোথায় পুলিশের এমন প্রশ্নের উত্তরে, হাসপাতালে আছে বলে জানান সুলতান। সন্দেহ বাড়ে পুলিশের। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে বেড়িয়ে আসে আসল তথ্য। কিন্তু গ্রেপ্তার হননি রোহিঙ্গা নারী ইয়াসমিন। অন্য দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করে তিনি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
শুধু ইয়াসমিনই নয় দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরি করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এক সময় শুধু কক্সবাজার থেকে দেধারসে পাসপোর্ট বানালেও এখন সারাদেশ থেকেই তৈরি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট। শুধু পর্যাপ্ত টাকা থাকলেই হাতের মোয়ার মতো সহজ হয়ে গেছে পাসপোর্ট তৈরির কাজ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলতো তিন দালাল চক্রের হাত ধরে বর্তমানে পাসপোর্ট তৈরি করছে রোহিঙ্গারা। তারা হলেন, কক্সবাজার জেলার পাহাড়তলী থানার ইসলামপুর গ্রামের মৌলভী নুর হোসেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাত্তারঘোনা গ্রামের আবদুস ছবির ছেলে হাফেজ আহম্মেদ ও রামু থানার ৬ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ মিঠাইছড়ির নিজেরপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম। এদের মধ্যে মৌলভী নুর হোসেন ও হাফেজ আহম্মদ রোহিঙ্গা। অনেক বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে বসতি গেড়ে পাসপোর্ট তৈরির কাজ করে আসছে তারা।
সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলাসহ নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট তৈরি করতে কাজ করছে হাফেজ আহম্মদ। এছাড়াও অন্যান্য জেলায় পাসপোর্ট তৈরিতে কাজ করছেন নুর হোসেন ও সাইফুল ইসলাম। এদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া অনেক পুরনো রোহিঙ্গারা।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট তৈরি করে দিচ্ছে দালাল চক্র। টাকা দিলেই বিভিন্ন জেলা থেকে একই নামের বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় ব্যবহার করে তুলে দেয়া হচ্ছে পাসপোর্ট।
পুলিশ সূত্র জানায়, পাসপোর্ট দালাল চক্রের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ট সম্পর্ক অনেক বছর আগে বাংলাদেশে এসে নাগরিকত্ব পাওয়া রোহিঙ্গাদের সাথে। ওইসব রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন চাকরিতে যোগ দিয়েছে। পরিচয় জাল করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে নতুন রোহিঙ্গারা। আর এই কাজে প্রধান ভ’মিকা পালন করছে ওই ৩ দালাল। বাংলাদেশী ভোটার আইডি, জন্মসনদ থেকে শুরু পাসপোর্ট অফিসের যাবতীয় কাজ করে দেন তারা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই দালাল গ্রুপকে সহযোগীতা করে পাসপোর্ট অফিসের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলার স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বহু বছর আগে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে ঘাটি গেড়েছে তারাই মূলতঃ এ ধরণের রাষ্ট্র বিরোধী কাজ করছেন। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো ভাবেই যেন কোনো রোহিঙ্গা পাসপোর্ট তৈরি করতে না পারে সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবলম্বন করা হচ্ছে। বহু বছর আগে এসে যারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে গেছে তাদেরকেও পাসপোর্ট দেয়া হচ্ছে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারের বাইরের জেলা থেকেও পাসপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে বলে শুনেছি। তবে কোনো দালাল যাতে কোনোভাবে রোহিঙ্গাদের প্রভাবিত করতে না পারে সেদিকে আমাদের সর্বোচ্চ নজরদারি আছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন