চাহিদা মেটাতে ঢাকায় ইয়াবার নতুন সিন্ডিকেট

020251Kalerkantho_19-08-26-36.jpg


তুরাগে নারীর কাছে কোটি টাকার চালান
ট্রেনে-উড়োজাহাজে আসছে ঢাকায় যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যেও


এস এম আজাদ

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই রাজধানীর মাদক কারবার। চাহিদা পূরণে নতুন রুট ও বিক্রেতা গড়ে এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে মাদক সিন্ডিকেট।

মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে প্রবেশের পর বর্তমানে দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চল সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ করছে। বিভিন্ন পণ্যের চালানের সঙ্গে, উড়োজাহাজে, ট্রেনে, শরীরের অভ্যন্তরে বহন করে ইয়াবা আনা হচ্ছে রাজধানীতে। ঢাকায় তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা আড়ালে থেকে নতুন বিক্রেতাদের দিয়ে ইয়াবা কারবার করাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেও পাচার হচ্ছে ইয়াবার চালান। সম্প্রতি রাজধানীতে একের পর এক ইয়াবার চালান উদ্ধারের ঘটনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার তুরাগে আসমা বেগম মুন্নি (৩৪) নামের এক নারীর বাসা থেকে ৪৩ হাজার ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব।এর আগে রবিবার যাত্রাবাড়ীতে ইসমাইল মোল্লা (২০), শাহীন মিয়া (২৫) ও শামীম মণ্ডল (১৯) নামের তিনজনের পায়ুপথে বহন করা দেড় হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর ইয়াবার চালান জব্দ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে ইয়াবা কারবারের ধরন পরিবর্তনের তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ‘মাদকের কারবার কমছে বা বাড়ছে, এটা বলা যাবে না। তবে আমাদের অভিযান ও মামলার সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিনই ইয়াবাসহ আসামি ধরা পড়ছে। কদিন আগেও উত্তরা থেকে পাঁচ হাজার ইয়াবাসহ এক নারী ধরা পড়ে। নতুন নতুন কারবারীর সন্ধান পাচ্ছি আমরা। ’

র‌্যাব-২-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এএসপি মোহাম্মদ সাইফুল মালিক জানান, রবিবার রাত দেড়টার দিকে তুরাগের উত্তর খায়েরটেক মহল্লার ১ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর টিনশেড বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মুন্নি নামের এক নারীর দেহ ও হাতে থাকা শপিং ব্যাগ তল্লাশি করে ৪৩ হাজার ৫০ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। তার বাড়ি খুলনার খালিশপুরে। জিজ্ঞাসাবাদে মুন্নি জানায়, ব্যাপক চাহিদা থাকায় চড়া দামে বিক্রি করতে টেকনাফ সীমান্ত এলাকা থেকে সংগ্রহ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার মাদক কারবারিদের কাছে সে ইয়াবা সরবরাহ করে। এর আগেও সে কয়েকটি চালান এনে বিক্রি করেছে। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম জসিমউদ্দিনের আদালতে মুন্নিকে হাজির করে তুরাগ থানার তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র‌্যাব-২-এর অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা মেজর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘মুন্নি কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ট্রেনে চালান আনে। তার কিছু নির্দিষ্ট ক্রেতা আছে। পেছনে আরো মাদক কারবারি আছে। এদের গ্রেপ্তারে আমরা অভিযান চালাব। ’

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, একটি মাদক কারবারিচক্র দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইয়াবার কারবার করে আসছে। তারা মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসা ইয়াবা কৌশলে আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করছে। এ চক্রের হোতা সোহেল। নাসির উদ্দিন সরকার নামের তার প্রধান সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ১৮ আগস্ট রাতে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণির ১৫ নম্বর রোডের একটি আবাসিক হোটেল থেকে আচারের দুটি বয়ামে ২৬ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি পাসপোর্টসহ নাসিরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে নাসির জানায়, ২০০৮ সালে তিন বছর মেয়াদি ভিসা নিয়ে দুবাই যায় সে। আবুধাবির মোসাম্বা শহরে বহুতল ভবনের জন্য এসি তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। সোহেলের সঙ্গে সেখানে তার পরিচয়। দেশে ফেরার পর মাঝেমধ্যে সোহেলের সঙ্গে কথা হতো। একপর্যায়ে সোহেল তাকে মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্ত করে। এরপর সে সিন্ডিকেটের হয়ে ২০-২৫টি বড় চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে। বিশ্বস্ত হওয়ার পর ইয়াবার চালান নিয়ে সোহেল তাকে দুবাই যেতে বলে। বিমানবন্দরে চেকিংয়ে মাদকের উপস্থিতি যাতে বোঝা না যায় সে জন্য একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়।

সোহেলের নির্দেশে নাসির কার্বন পেপারে ইয়াবা মুড়িয়ে তার ওপর কালো স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে দুটি আচারভর্তি বয়ামের ভেতর নেয়।

এদিকে গত ৯ আগস্ট রামপুরার উলন রোডের একটি বাড়ি থেকে আব্দুস ছবুর মিয়া, জাকির হোসেন ও শামসুল আলমকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি। আসামের স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুস ছবুর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, আসামের একটি মাদক সিন্ডিকেট থেকে ইয়াবা কেনে সে। পরে তা কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এরপর কুড়িগ্রামের সহযোগীদের মাধ্যমে তা ঢাকার পাইকারি কারবারিদের হাতে তুলে দেয়।

গত ১৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ জসিম উদ্দিন (৩৬) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নভোএয়ারের ফ্লাইট ভিকিউ ৯৩৪ যোগে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় পৌঁছে জসিম। দেহ তল্লাশি করে তার কোমরে বিশেষ কায়দায় বানানো মোটা বেল্ট থেকে দশ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ’ এর আগেও বেশ কটি চালান জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় আনা হচ্ছে। তথ্য পাওয়ার পরে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে এপিবিএন।

ঈদুল আজহার দিন রাতে ৫৭/১ মেরাদিয়া নয়াপাড়া থেকে আট হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ আবুল কাশেম (৫০) ও ফাতেমা বেগম (৩৫) নামের এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় হাসান (৩০) নামের তাদের এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বনশ্রীতে কাশেমের বাসা থেকে আরো চার হাজর ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

ঈদের আগের দিন রবিবার কমলাপুর রেলওয়ে থানা এলাকা থেকে ৯ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবাসহ মিজানুর রহমান (২৬) নামের এক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। ঢাকা রেলওয়ে পার্সেল ইনওয়ার্ড অফিস থেকে পার্সেল নেওয়ার সময় আটক হয় সে।

 

 

আপনার মন্তব্য লিখুন