ক্যাথলিক খ্রিস্টান থেকে মার্কিন নারীর ইসলাম গ্রহণের মর্মস্পর্শী কাহিনী

47178357_207237040185097_2587545528996724736_n-5.jpg

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নিউইয়র্ক: ‘ভালোবাসা আমাকে বিশ্বস্ত করে। আন্তরিকতা আমাকে পথ দেখায়।’

আমি জন্ম নিয়েছি একটি অনুসন্ধিৎসামূলক মন নিয়ে যা আমাকে প্রায় সবকিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র একটি বিষয়ে আমি কখনো প্রশ্ন করতাম না আর তা হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব এবং তার ক্ষমতা সম্পর্কে।

আমি যখন একজন ছোট মেয়ে ছিলাম ঠিক তখনও আমি আমার মায়ের দেয়া বিভিন্ন আদেশের প্রতি উত্তরে বলতাম- ‘আমার কি করা উচিত তা আপনি বলে দিতে পারেন না, শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারেন আমার কি করা উচিত।’ এমনকি আমার পাঁচ বছর বয়সের সময়ও আমি এধরনের প্রতিউত্তর দিতাম।

আমি একটি আইরিশ-ক্যাথলিক পরিবারে বড় হয়েছি। কিন্তু বর্তমানে আমি যা উপলব্ধি করি তা হচ্ছে আমি কখনো ক্যাথলিক ধ্যানধারণাকে আমার বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করতে পারি নি।

আমি একরোখাভাবেই সৃষ্টিকর্তা এবং যিশুকে অনুসরণ করতে চাইতাম। কিন্তু আমি একজন ক্যাথলিক হিসেবে তা আন্তরিকতার সাথে করতে পারতাম না। আমার বয়স যখন ১৩ বছরে পৌছায় তখন আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম যে, একমাত্র ইসলাম ধর্মই আমাকে এ সুযোগ দিতে পারে।

সময়ের সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম যে, ইসলাম আমার ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা ক্যাথলিকইজমে আমি খুঁজে পাই নি। আর এটাই হচ্ছে আমার ধর্মান্তরিত হওয়ার কাহিনী।

আমার সন্দেহই আমাকে নতুন বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়

আমি আমার ধর্ম বিশ্বাস ক্যাথলিকইজমের অনেক কিছুই যাচাই-বাঁচাই করে দেখেছি। প্রথমত, আমি কখনো বিশ্বাস করতে পারতাম না যে, যিশু একজন সৃষ্টিকর্তা। হ্যাঁ, আমি যিশুকে ভালোবাসি কিন্তু আমার দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র একজন এবং কোনো মানুষ কখনো সৃষ্টিকর্তা হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, আমি কখনো আদি পাপের বিষয়টি মেনে নিতে পারতাম না। (খ্রিষ্ট ধর্মের বিশ্বাস মতে, আদি পাপ বলতে বোঝায়- একজন শিশু জন্ম গ্রহণ করার সময় প্রকৃতিগতভাবেই পাপী হয়ে পৃথিবীতে জন্মায় এবং তাকে পাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে ব্যাপ্টিজমের মাধ্যমে শুদ্ধ হতে হয়।) আমার মনে হতে থাকে এটি খ্রিষ্টান ধর্মের নতুন কোনো আবিষ্কার।

তথাপি আমি খ্রিষ্টান ক্যাথলিকই রয়ে গেলাম এবং আমি আসল সত্যের অনুসন্ধান চালিয়ে গেলাম যা আমাকে আমার মনে উদয় হওয়া সমস্ত কিছুর পরিষ্কার জবাব দিতে পারবে। তা কোথায় ছিল, আমি ঠিক জানতাম না। তবে আমি সত্যিই আশায় থাকতাম যে, আসল সত্য কোথায়ও না কোথায়ও রয়েছেই।

সেইন্ট থমাস মুর এবং ম্যালকম এক্স আমাকে সত্য উদঘাটন করার জন্য সাহস যুগিয়েছেন

যুবতী থাকাবস্থাতেই আমি ধর্মযাজক হিসেবে সেইন্ট থমাস মুরকে ভালবাসতাম। তিনি তার বিশ্বাসে অটল থেকে মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন এবং আজীবন সৃষ্টিকর্তার প্রতি অনুগত ছিলেন যা আমাকে ব্যাপক উৎসাহ যোগায়।

আমি অবশ্য ম্যালকম এক্স দ্বারাই অনুপ্রাণিত হই। কলজের বছরগুলোতে আমি ম্যালকম এক্স এর জীবনী অধ্যয়ন করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের ধ্যান ধারণার সাথে পরিচিত হই। এটি ধর্ম ছিল না যার প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম, এটি ছিল সত্য উদঘাটন করার জন্য ম্যালকম এক্স এর তৃষ্ণা যার প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম।

সেইন্ট থমাস মুর এবং ম্যালকম এক্স এ দুজনের জীবনী আমাকে এই উপলব্ধি এনে দেয় যে, যদি আমি সত্য খুঁজতে থাকি তবে খুব সম্ভবত আমি একই সাথে সৃষ্টিকর্তার এবং সত্যের সন্ধান পেয়ে যাবো।

পশ্চিম আফ্রিকায় আমি ইসলামের যিশুকে আবিষ্কার করি

কলেজে অধ্যয়নের শেষে আমি পশ্চিম আফ্রিকায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় স্বেচ্ছা শ্রম দিতে যাই। সেখানে আমি ঘানার একজন স্বেচ্ছা সেবকের পাশে বসে ছিলাম এবং রোদ থেকে বাঁচতে আমার মাথায় একটি কমলা রঙয়ের কাপড় দিয়ে ঢেকে দিই।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকে হিজাবে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘আপনি কি মুসলিম’? এবং তার সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে জানালেন যে, মুসলিমরা যিশুকে একজন নবী হিসেবে সম্মান করেন।

তার সাথে আলোচনা আমাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং আমি এই চিন্তা করতে থাকলাম যে, ইসলাম ধর্মই কি সে ধর্ম যা আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে?

এর পরে বাড়ি ফিরে এসে আমি আমার পিতাকে সমস্ত কিছু খুলে বলি যাতে করে আমি একটি দিকনির্দেশনা পেতে পারি। তিনি আমার কথা শুনলেন এবং আমাকে সাধারণ একটি উপদেশ দিলেন: পড়।

আমি যখন পড়া শুরু করলাম, ইসলাম আমাকে খুঁজে নিয়েছিল

আমি আমার অবসর সময়গুলোতে দর্শন, মনোবিদ্যা, কবিতা এবং ধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন বই অধ্যয়ন করা শুরু করলাম। ধীরে ধীরে আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত বই সমূহের প্রতি ঝুঁকে পড়লাম।

আমি যত বেশি ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করলাম তত বেশি বুঝতে পারলাম যে, এটি একটি মূল্যবোধের চেয়ে বেশি কিছু, এটি একটি জীবন দর্শন।

আমি তখন একজন পথপ্রদর্শক খুঁজতে থাকলাম যিনি আমাকে জীবনের অর্থ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন আর আমি সেরকম একজনকে পেয়ে গেলাম। তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত কর্মঠ নারী, যার ভালোবাসাপূর্ণ একজন স্বামী রয়েছে এবং অসাধারণ দুজন সন্তান রয়েছে।

আমরা প্রতি সপ্তাহে একবার করে দেখা করতে থাকলাম। তিনি আমাকে মহানবী মুহাম্মদ(সাঃ) এবং তার সাহাবীদের সম্পর্কে বলতেন। একই সাথে তিনি জানালেন যে, যিশুকে ইসলাম ধর্মে নবী হিসেবে সম্মান করা হয় এবং আদি পাপের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।

কিভাবে প্রার্থনা করতে হয় তিনি আমাকে শিখিয়েছেন এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় পবিত্র কোরআনের একটি কপি দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি আমাকে শাইখ হামজা ইউসুফের কয়েকটি সিডি দিয়েছিলেন যেগুলোর শিরোনাম ছিল- ‘Purification of the Heart’ যখন আমি শাইখ হামজা ইউসুফের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শুনতাম তখন আমার হৃদয় একেবারে বিগলিত হয়ে যেত।

এভাবেই আমি রমজান মাসে উপবাস করতে শুরু করি। আমি ধীরে ধীরে সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগসূত্র অনুভব করতে থাকি এবং আমি বুঝতে পারি যে, আমি এখন আমার পছন্দের বিশ্বাস হিসেবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত।

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় এবং আমার মেন্টরের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি ২০১৬ সালের রমজান মাসের ২৭ তারিখে শাইখ হামজা ইউসুফের সাথে দেখা করি। তিনি আমাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য শাহাদা পাঠ করান যা ছিল এমন কিছু শব্দ যেগুলো আমি অতি আন্তরিকতার সাথে পাঠ করেছিলাম।

আমি তখন থেকে অনুভব করতে থাকি যে, আমি চূড়ান্তভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পেরেছি।

কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় আমার সত্যিকারের পথ ইসলাম পেয়েছি

সেসময় আমাকে যা বিশ্বস্ত করতে শিখিয়েছিল তা এখনো আমাকে বিশ্বস্ত রাখে। একমাত্র ভিন্নতা হচ্ছে, বর্তমানে আমি যে অবস্থানে রয়েছি তা আমাকে আমার অতীতকে সম্মান দিতে শিখিয়েছে যদিও আমি আমাদের মহান সূত্রসমূহ থেকে সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছিলাম।

আইরিশ-ক্যাথলিক বংশোদ্ভূত একজন মুসলিম হিসেবে, আমি জানি না ঠিক কোথায় আমি সঠিকভাবে খাপ খাওয়াতে পারবো। কিন্তু প্রতিদিন সকালে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি বিসকাইনে বেতে আমি যখন একাকী প্রার্থনা করি তখন আমার মনে হয় এটিই আমার উপযুক্ত বাসস্থান। আমার কাছে এখন এটিই সবকিছু।

সূত্রঃ হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত ক্যাথরিন হউলিহানের কলাম থেকে।

আপনার মন্তব্য লিখুন