কিসের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড?

-9.jpg

কয়েক দিন ধরে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে খুব আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কেউ বলছেন, নির্বাচন উপলক্ষে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। আবার আরেক পক্ষ দাবি করছে, সৃষ্টি হয়েছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। কিন্তু আসলেই কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেউ চায়? এটি কি আদৌ সম্ভব?

বহুদলীয় ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেই চলছে। গত দুই দশকের হিসাব নিলে দেখা যাবে, প্রতিটি নির্বাচনের আগেই সৃষ্টি হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিতর্ক। সেই হিসেবে এই বিতর্কটা বেশ পুরোনো। কখনো আওয়ামী লীগ, আবার কখনো বিএনপি এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি করে এসেছে। মজার বিষয় হলো, কখনোই সরকারে থাকা বা সরকার থেকে সদ্যবিদায়ী রাজনৈতিক দল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি করেনি। তাদের সব সময়েরই দাবি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে ক্ষমতার বলয়ে না থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সব সময়ই ‘সমান সুযোগের অভাবের’ কথা বলে এসেছে।

চলতি সপ্তাহে দেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিতর্ক’ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘আমি মনে করি না নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।’ (প্রথম আলো ডটকম, ১৭.১২.১৮)। এর পরদিনই এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘মাহবুব তালুকদার সত্য বলেননি। নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।’ (প্রথম আলো ডটকম, ১৮.১২.১৮)।

পাল্টাপাল্টি এই দুই বক্তব্যে এখন দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত। এক পক্ষ বলছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যে নেই, তা নির্বাচন কমিশনারের কথায় প্রমাণিত হয়েছে। আরেক পক্ষ এর বিরোধিতা করছে।

আচ্ছা, আমাদের বিদ্যমান সমাজে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে আদতেই কি কিছু আছে? এই দেশে সবাই কি সমান সুযোগ-সুবিধা পান? উত্তর নেতিবাচক হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরতে পরতে আছে বৈষম্যের উপাদান। এখনো আমরা বাল্যবিবাহের হার কমাতে লড়ে যাচ্ছি। শিক্ষার হার বাড়াতেও চেষ্টা করছি। আর মুক্তবাজার অর্থনীতির এই দেশে ধন-সম্পদের বৈষম্যের কথা আর নাই বা বললাম। একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করুন তো, আপনার সন্তান ও তার সমবয়সী গৃহকর্মী কি সম-অধিকার ভোগ করে? আপনি কি সেই সুযোগ দেন? ইতিবাচক উত্তর খুব কমই আসবে। তা সমাজের যখন এই অবস্থা, তখন সেই সমাজে বিদ্যমান রাজনীতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আশা করা কতটুকু যৌক্তিক?

‘বিদ্যাসাগরচরিত’ নামের লেখায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গদেশের’ একটি ছবি এঁকেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না।’ ছবিটা বেশ স্পষ্ট। যদি ব্যক্তিজীবনেই সমতা নিশ্চিতের চর্চা না হয়, তবে সমাজে বা রাষ্ট্রে হবে কী করে? আবার ব্যক্তির যে ভুল আপনি-আমি এড়িয়ে যেতে পারি, সমাজ বা রাষ্ট্র সেই একই কাজ করলে কি চোখ বুজে থাকা সম্ভব? সম্ভব না। কারণ তা আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে।

এবার আসি, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির বিষয়ে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি করার অর্থ হলো, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সব দল ও সব প্রার্থী সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কিন্তু প্রশ্ন যখন ক্ষমতা দখলের, তখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে কেউ সন্তুষ্ট হবেন বলে মনে হয় না। সরকার বা বিরোধীপক্ষ—কেউই না। কারণ এখন গণতন্ত্রের সমার্থক বলতে নির্বাচনকেই কেবল বোঝানো হয়। আর সেই নির্বাচনকে আমরা দেখি ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে। এ দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ হিসেবে কেউ এর চর্চা করেন বলে মনে হয় না। যখন ক্ষমতায় যাওয়াই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমানে সমান কে হতে চাইবে? প্রতিযোগিতার হিসাবে বরং প্রতিপক্ষের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকাই সুবিধাজনক। তাই যতটা এগিয়ে থাকা যায়, ততটাই লাভ!

এই হিসাব আমাদের সরকারি ও বিরোধী—দুই পক্ষের রাজনৈতিক দলেই আছে। যতই ভোটের আগে কেউ বলুক না কেন—নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেব, এখনো পর্যন্ত নিঃশর্তভাবে জনগণের রায় মেনে নেওয়ার ঘটনা এ দেশের জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে দেখা যায়নি। তাই বিরোধীরা শুরু থেকেই বলতে থাকেন, প্রহসনের নির্বাচন হচ্ছে। ভোটাভুটিতে হেরে গেলে, পরে তা আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়। সরকার পক্ষও হেরে যাওয়ার পর কারচুপির অভিযোগ তোলে হাস্যকরভাবে! গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসার এত বছর পরও ভোটের বিজয়ী ও বিজিত পক্ষের এই পারস্পরিক দোষারোপের চিত্রনাট্য বাংলাদেশে একই রয়ে গেছে। এখনো আমরা বারংবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করি, তা হোক সরকার পক্ষ বা বিরোধী পক্ষ!

আমাদের দেশে গণতন্ত্র এখনো বিকাশমান। তাত্ত্বিকভাবে বললে, আমরা পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। আছি উত্তরণকালে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্রের পুরো চেহারা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আমরা মনে করি, পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোয় প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রই বুঝি আদর্শ! তাই আদর্শ বলতে আমরা সেগুলোর উদাহরণই টানি। তবে সেই কথিত ‘আদর্শ’ মডেলে নিজেদের সাজানোর প্রচেষ্টাও খুব একটা দেখা যায় না।

সেই প্রচেষ্টা থাকলে, আমাদের নির্বাচন কমিশনের সচিব একজন প্রার্থীকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পারতেন না। কারণ, গণতন্ত্রের প্রধান ভিতই হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন, আইনের চোখে সমান থাকবেন। গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘হিরো আলম পর্যন্ত হাইকোর্ট দেখায়। সেও বলে যে “নির্বাচন কমিশনকে আমরা হাইকোর্ট দেখিয়ে ছাড়ছি।” বোঝেন অবস্থা!’

এই বক্তব্যটি পড়লেই এর তুচ্ছার্থক ভাবটি অনুধাবন করা সম্ভব। তবে কি, ইসি সচিবের দৃষ্টিতে হিরো আলম কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেননি? হিরো আলমের অন্যান্য কাজ কি তাঁর নাগরিকত্বের সার্টিফিকেটে ধুলো ফেলেছে? কিন্তু গণতন্ত্রের হিসাবে তো তা হওয়ার কথা নয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, হিরো আলম এই রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত নাগরিক এবং তাঁর মর্যাদাহানি রাষ্ট্রের কাজ নয়। এখন হিরো আলম যদি দাবি করেন, ইসি তাঁকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দিচ্ছে না, তবে কি ভুল হবে?

শেষ করছি কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কথা দিয়ে। এক কৌতুক নাটিকায় তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন সব বিষয়ের পরামর্শদাতা হিসেবে। প্রতিবার ১২ টাকার বিনিময়ে একেকজনকে যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ দিতেন ভানু। তো এক নারী এসেছিলেন তাঁর কাছে। বলেছিলেন, অন্ধকার ও গরমে বড্ড কষ্ট পাচ্ছেন। জানতে চেয়েছিলেন, পরিত্রাণের উপায় কী? তো উত্তরে ভানু বলেছিলেন, মাস দু-এক দেখেন, ঠিক হয়ে যাবে। ওই নারীর কথা, দুই মাসে ঠিক হবে তো? ভানুর উত্তর, ঠিক না হলে আরও মাস তিনেক সহ্য করবেন। নারীর জিজ্ঞাসা, এই পাঁচ মাসে ঠিক হবে তো? ভানু বললেন, পাঁচ মাস সহ্য করার পর, ফাউ হিসেবে আরও দু-এক মাস যাবে। নারীর মরিয়া জিজ্ঞাসা, তখন? ভানুর মোক্ষম জবাব, ‘তখন তো আর চিন্তাই নাই। অন্ধকার ও গরম সহ্যকরণ অভ্যাস হইয়া যাইব।’

এই দেশের নাগরিক হিসেবে এমন অনেক মাস আমরা পার করে দিয়েছি। সহ্য করেই চলেছি। আর কিছুদিন করলে অভ্যাসগুলো পাকাপোক্ত হয়ে যাবে। তখন আর চিন্তা থাকবে না!

অর্ণব সান্যাল: সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন