উপকূলে ফিরছে ঘরহারা মানুষ

photo-1523984638-5.jpg

আজিম নিহাদ :
শওকত আলী। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড়ের সময় টবগবে তরুণ তিনি। দাখিল পরীক্ষা থাকায় সেইদিন তিনি ছিলেন মহেশখালী পৌরসভা এলাকায়। বাকিটা বলতে গিয়েই আতঁকে উঠেন শওকত আলী।
ঘুর্ণিঝড়ের পরে ধলঘাটা ইউনিয়নের সিকদারপাড়ায় গিয়ে দেখেন বাবার নিথরদেহ আটকে আছে জানালার ফাঁকে। মা, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়দের লাশও মিলেনি সেদিন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান দুইবোন। সিকদারপাড়ায় ৬৬ জন মানুষ বসবাস করতেন। এরমধ্যে বেঁচে ছিলেন মাত্র ২৬ জন। সেইদিন ৪০ জনের প্রাণ কেড়ে ‘ম্যারি এন’। বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ে শওকতের বসতভিটা।
ঘুর্ণিঝড়ের পর দুইবোনকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি পাড়ি জমান মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের পাহাড়ী এলাকায়। সেখানে নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু হয়। তবে নাড়ি ছেড়া বসতভিটার জন্য শওকতের মন কেঁদেছে সব সময়। অপেক্ষায় ছিলেন, কখন বসবাসের যোগ্য হবে তাঁর বাপ-দাদার সেই বসতভিটা। আর তিনি কখন ফিরবেন সেখানে।
শওকত দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলো এক বছর আগে। তিনি ফিরেছেন বাপ-দাদার বসতভিটায়। এটি এখন বসবাসের যোগ্য। তাঁর জমিতে এখন লবণ উৎপাদন হয়। জমির দামও হয়েছে বহুগুণ।
শওকত আলী এখন তিন সন্তানের জনক। পরিবার নিয়ে বেশ ভালই আছেন। তবে সেইদিনের দুঃসহ স্মৃতি তাঁর পিছু ছাড়ছে না। প্রতিক্ষণেই তাঁর মনে হয় বাবা-মা যেন বলছেন, ‘অপুত আঁরারে বাঁচা’ (খোকা আমাদের রক্ষা কর )।
শওকত আলীর সাথে মুঠোফোনে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ঘরহারা মানুষের কথা কেউ বিবেচনা করেনি। একারণে সেখানে ফেরার মত অবস্থা তৈরী হয়নি। কিন্তু এখন বেড়িবাঁধের অবস্থা আগের মত নেই, অনেক নিরাপদ। তিনি এবার ধলঘাটায় লবণ চাষ করেছেন। উৎপাদনও হয়েছে। তিনি ধীরে ধীরে ধলঘাটার সিকদারপাড়ায় পুরনো বসতভিটায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করতে চান।
তিনি আরও বলেন, ধলঘাটার যেখানে এক সময় মানুষের যাতায়াত ছিল না, সেখানে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে জায়গা-জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। এলাকাও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
একই গল্প কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের মো. জাহাঙ্গীর আলমের। প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের পর তিনি পরিবার নিয়ে কক্সবাজার শহরে চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন বসবাসের পর কয়েক বছর আগে তিনি গ্রামে ফিরে যান। বর্তমানে তিনি তাঁর এলাকার নির্বাচিত মেম্বার।
তিনিও জানান, তাঁর পৈত্রিক ভিটাটি বসবাসের যোগ্য হওয়ায় তিনি পূণরায় সেখানে ফিরে গেছেন। তবে তিনি চান পুরো কুতুবদিয়ার চারপাশে যেন স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর মহেশখালীতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। পদ্মাসেতুর চেয়েও বেশি বাজেটের প্রকল্পও বাস্তবায়ন হচ্ছে মহেশখালীতে।
কয়লাবিদ্যুৎ, এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্র বন্দর, অর্থনৈতিক জোন এখন প্রায় দৃশ্যমান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে মহেশখালীর অনেক অজপাড়া ও অরক্ষিত গ্রাম এখন সীমাহীন অগ্রগতির পথে।
আগামি কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল যোগান যাবে মহেশখালী থেকে। এছাড়াও কুতুবদিয়াকে ঘিরেও কম উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়নি সরকার। সরকার ওই দ্বীপকে অন্যতম পর্যটন স্পট বানাতে চায়।
মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সৈয়দুল কাদের বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উন্নয়নের কথা বলে প্রতারণা করা হয়। সেই সময় বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা মহেশখালীর উন্নয়ন প্রকল্প গুলো নিয়ে যান পাশর্^বর্তী এক উপজেলায়। এরফলে বঞ্চিত হয় ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তরা। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উন্নয়নে কোন কাজ করেননি। যার কারণে বেশির ভাগ এলাকা জোয়ার-ভাটায় পরিণত হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালে আশেক উল্লাহ রফিক এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এই দুই উপজেলার উন্নয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা হয়। যার ফলে উপকূলের মানুষ এখন নিরাপদ বোধ করছেন। তাই ঘুর্ণিঝড়ের সময় স্থানচ্যূত মানুষ গুলো ধীরে ধীরে পৈত্রিক বসতভিটায় ফিরে যাচ্ছেন।
মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক গত বুধবার দৈনিক কক্সবাজারের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, লোকজন এখন জানে উপকূল অনেক বেশি নিরাপদ। মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরেছে। তাই তারা এখন আবার পৈত্রিক বসতভিটায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। তাদের ধারণা যে, সরকার যেহেতু দুর্গম এলাকায় লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তায়ন করছে, তাই এসব এলাকা পুরোপুরি নিরাপদও করবে।
তিনি আরও বলেন, কুতুবদিয়া দ্বীপের চারপাশে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে বর্তমানে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১৩২ কোটি টাকার কাজ চলছে। মহেশখালীতেও লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প থেকে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়াও মহেশখালীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৫৭ কোটি টাকার কাজ চলছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন