আলোচনায় আ.লীগের সাড়া ইতিবাচক, কিন্তু..

images-5-1.jpeg
    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ড. কামাল হোসেন

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য পাঠানো ড. কামাল হোসেনের অনুরোধের জবাবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সংলাপে সম্মত হয়েছেন, তা বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক অগ্রগতি। ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একে স্বাগত জানানো হয়েছে।

এই আলোচনার জন্য ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের গণভবনে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানোর অর্থ হচ্ছে, আলোচনার স্থানও নির্ধারিত হয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, দুই পক্ষ কোনো রকম শর্তারোপ না করেই আলোচনার দরজা উন্মুক্ত করেছে। একটি শর্ত অনেক ব্যাখ্যা দাবি রাখে, চিঠিতে বলা হয়েছে যে ‘সংবিধানসম্মত বিষয়ে’ আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। তারপরও এটা একাদিক্রমে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট আছে, তার স্বীকৃতি এবং আওয়ামী লীগের পূর্বঘোষিত অবস্থান থেকে সরে আসার লক্ষণ। অন্যদিকে এটা প্রমাণ করছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সংকটের সমাধানে আন্তরিক। আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী যে মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব, সেটাও আপাতত হলেও দৃশ্যমান।

একে উভয় পক্ষই তাদের রাজনীতির ‘সাফল্য’ বা ‘বিজয়’ বলে দাবি করতে পারে, কিন্তু এই ধরনের দাবি না করাই রাজনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ আচরণ হবে। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সেই প্রাজ্ঞতার নির্দেশ করে যদিও সংলাপের কথা ঘোষণা করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘কারও চাপের মুখে বা নতিস্বীকার করে নয়, আমাদের পক্ষ থেকে কাউকে ডাকিনি।’ আলোচনার ব্যাপারে সম্মতি মাত্রই কিছু অর্জিত হওয়া নয়, সমাধানের প্রশ্ন তো অনেক দূরের বিষয়। ফলে, এখন সবার পক্ষ থেকেই দরকার ধৈর্য প্রদর্শন করা এবং আলোচনার সাফল্যের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালানো। আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো ধরনের অত্যুৎসাহী আচরণ অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থার সূচনা করবে। আশা করি, দুই পক্ষের নেতারা যেমন, তেমনি সমর্থকেরাও তা মনে রাখবেন।

এই ধরনের আলোচনার সাফল্য নিয়ে যাঁরা সংশয়াপন্ন, তাঁদের সন্দেহ ও সংশয় বাস্তবোচিত। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধীপক্ষের আলোচনা কখনোই সফল হয়নি, এমনকি বিদেশি মধ্যস্থতাকারী সত্ত্বেও। অতীতের ইতিহাস যাঁদের জানা নেই, ২০১৩ সালের জাতিসংঘের মহাসচিবের দূত অস্কার তারানকোর চেষ্টা তাঁদের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। এই আলোচনা ভেঙে যাওয়ার কারণ বিষয়ে বিভিন্ন রকমের ভাষ্য আছে। সেখানে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, যা আর বাস্তবের মুখ দেখেনি—এমন কথাও আছে। প্রাসঙ্গিকভাবে ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়াকে করা টেলিফোনে আলোচনার জন্য আহ্বানের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেই সময়ে খালেদা জিয়া সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটেছে। খালেদা জিয়া এখন দণ্ডিত হিসেবে কারাগারে; বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার এই প্রসঙ্গ যেদিন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়, সেদিন তাঁকে আরেকটি মামলায় সাত বছরের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিএনপি এসব দণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছে, জাতীয় ঐক্যও খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছে। শুধু তা–ই নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। ২০১৪ সালের একপক্ষীয় নির্বাচন, গত চার বছরে ক্ষমতাসীনদের বলপ্রয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি, সমাবেশ ও মতপ্রকাশের মতো মৌলিক অধিকারের মারাত্মকভাবে সংকোচন তার প্রমাণ। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও অন্যান্য জোটের আবির্ভাব ঘটেছে। অবস্থার কতটা বদল ঘটেছে, তার একটা সহজদৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালে ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচক, আজকে সেই সংগঠন প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনার আয়োজন করছে।

কমবেশি সব নাগরিকই আলোচনার মাধ্যমে আশু সংকটের অবসান চাইলেও অনেকেই সংশয়ী, সন্দিহান। আমি নিজেও আমার আগের আলোচনায় সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে আলোচনাকে সম্ভাব্য একটি সিনারিও বা দৃশ্যপট হিসেবে বিবেচনা করেছি। একে আমি আনলাইকলি বা দুর্ঘট সিনারিও বলে বর্ণনা করলেও তা যে একটা সম্ভাবনা এবং সংকট সমাধানের একটা উপায়, তা বিবেচনা করার দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সচেষ্ট হয়েছি (দেখুন, ‘নতুন মেরুকরণে কে কোন দিকে,’ প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০১৮)। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সেই দৃশ্যপটকে বাস্তবে পরিণত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং ক্ষমতাসীনেরা তাতে অনাগ্রহী হননি।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ইতিহাসকে অনিবার্য ভবিষ্যৎ বলে মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এসব আলোচনার অধিকাংশ সফল হয়নি দ্বিপক্ষীয় আস্থার অভাবে এবং ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা বা অনীহার জন্য। ফলে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সরকারের ওপরেই বেশি দায়িত্ব বর্তায়। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে ছাড় দেওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাকে আন্তরিক বলেই বিবেচনা করতে চাই এবং তা যে আন্তরিক ছিল, তা প্রমাণের সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। ছাড়ের ধরন সব সময় একই হতে হবে তা নয়, কেননা রাজনীতির অবস্থার বদল ঘটেছে। কিন্তু উদ্দেশ্য যে অভিন্ন—আশু রাজনৈতিক সংকট সমাধান করে সহিংস অবস্থার আশঙ্কাকে দূরীভূত করা—সেটা বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ মনে করতে পারে, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করতে হচ্ছে না, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সংলাপে বসতে হচ্ছে না, সেটা তাদের সাফল্য। দল হিসেবে তাদের এই রকম মনে করাকে একেবারে নাকচ করে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এই সাফল্যকে তারা কীভাবে ব্যবহার করতে চায়, সেটাই দেখার বিষয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই আলোচনা কীভাবে এগোবে এবং কী আশা করা উচিত হবে। প্রথম বিষয় হচ্ছে এই সংলাপকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই। কেননা, এই আলোচনা দীর্ঘায়িত করার অর্থ হবে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়া যে সরকার কালক্ষেপণের কৌশল গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেহেতু তাদের সমর্থনে সভা–সমাবেশ করতে চাইছে এবং শুরু করেছে, সেহেতু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মনে হবে, ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে যে মোমেনটামের লক্ষণ আছে, তাকে গতিহীন করা হচ্ছে আলোচনার উদ্দেশ্য—সংকটের সমাধান নয়। সেটি নিকট ভবিষ্যতের জন্যই ক্ষতিকারক পরিস্থিতির সূচনা করবে। তাতে ক্ষমতাসীনেরা লাভবান হবেন বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে আলোচনার পাশাপাশি জনসংযোগ অব্যাহত না রাখলে তাদের পক্ষে কিছু অর্জন করা সম্ভব হবে না।

ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারের আলোচনার এই সংবাদের প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে অন্য জোট ও দলের সঙ্গে আলোচনা নয় কেন? এই ধরনের আলোচনার তাগিদ ও গুরুত্বের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ কারার সুযোগ নেই। কিন্তু এই দাবিকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী পক্ষের আলোচনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তাতে আলোচনার মূল উদ্দেশ্যই পর্যুদস্ত হবে। তার দায়িত্ব কেবল সরকারের ওপরে বর্তাবে না, যাঁরা এই দাবি তুলে সেই সুযোগ সৃষ্টি করবেন, তাঁদের ওপরেও বর্তাবে। সেই আশঙ্কা মোকাবিলার জন্য ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব অন্য জোট ও দলের অবস্থানগুলো জানা, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং তাদের যেসব অভিন্ন দাবি আছে, তা সরকারের কাছে তুলে ধরা।

ড. কামাল হোসেনকে পাঠানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত চিঠি। ছবি: সংগৃহীতড. কামাল হোসেনকে পাঠানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত চিঠি। ছবি: সংগৃহীত

সবার অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য অবাধ নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার জন্য সময় অত্যন্ত কম। কিন্তু এসব ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব—এমনকি আলোচনার আগেই। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের সভা-সমাবেশের ব্যাপারে যেসব বাধাবিঘ্ন তৈরি করা হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করা, ফ্রন্টের যেসব নেতা–কর্মী আটক আছেন, তাঁদের মুক্তি দেওয়া, রাজনৈতিক ভিন্নমতের জন্য যেসব ব্যক্তি আটক আছেন—যেমন খ্যাতনামা আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন—তাঁদের মুক্তি দেওয়া। যুক্তফ্রন্টের নেতা–কর্মীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিপীড়ক আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখা।

সংলাপের মধ্য দিয়ে অন্যান্য বিষয় উত্থাপিত হবে এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে নিশ্চয় পারস্পরিক বোঝাপড়ার দরকার হবে। সে জন্য সময়ের প্রয়োজন দেখা দেবে বলে অনুমান করি। নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সময়ের ব্যবস্থা করতে চাইলে সরকার এই সংসদের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার অব্যবহিত আগে সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। সংবিধানের ১২৩(৩)খ-এর বিধানে বলা আছে, মেয়াদ শেষ করার আগে ভেঙে দেওয়া হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। এই ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি তখনই সবার আছে গ্রহণযোগ্য হবে, যখন এর উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় থাকবে না।

ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপে সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন আশা করার কারণ নেই। দেশের রাজনৈতিক সংকটের মাত্রা ও গভীরতা অনেক বেশি; কিন্তু অন্ততপক্ষে সবার মতপ্রকাশের পথে বাধা সামান্য হলেও অপসারিত হয় এবং সবার অংশগ্রহণমূলক অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেখানে ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন, তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, সেটাই হবে সংলাপের সাফল্য।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।

আপনার মন্তব্য লিখুন