অদূরদর্শিতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সৌদি রাজপরিবার

204029_1.jpg

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রিয়াদ: সমাজ সংস্কারক হিসেবে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এতদিন পশ্চিমাদের কাছে একটি ‘গোলাপি প্রতিকৃতি’ হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তার রাজনৈতিক পশুত্বের কারণে তার এমন মূল্যায়ন ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।

এতকিছু সত্ত্বেও পুরো বিশ্বকে আগামী কয়েক দশক ধরে তার শাসন প্রত্যক্ষ করতে হবে। কেরে

কেননা, বর্তমানে মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

তার পিতা বাদশা সালমান এমনকি ৩১ বছর বয়সী বিন সালমানকে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং গত বছর তার চাচাতো ভাই মুহাম্মদ বিন নায়েফের পরিবর্তে সৌদি সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে তাকে মনোনীত করেছেন।

সৌদির বর্তমান বাদশা সালমানের (স্মৃতিভ্রম রোগ) সুবাদে এবং ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার সুযোগে বিন সালমান প্রশ্নাতীত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

কিছুদিন পূর্বেও ধর্মীয় পুলিশের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ এনে এবং নারীদেরকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়ে বিন সালমান একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

এমনকি সৌদি আরবের ইতিহাসে প্রথম উন্মুক্ত স্থানে নারী সংগীত শিল্পী দ্বারা মিউজিক কনসার্টের আয়োজন করে এবং দেশটি প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামে নারীদের জন্য ক্রীড়ার ব্যবস্থা করে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন।

সৌদি আরবকে আধুনিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছিলেন।

এতদসত্ত্বেও ক্রাউন প্রিন্সকে অন্তত পশ্চিমারা একজন আদর্শিক লোক হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল।

এত আলোচনার পরে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিন সালমান পুনরায় আন্তর্জাতিক পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন তবে তা ইতিবাচকভাবে নয় বরং নেতিবাচক ভাবে।

লোয়ি ইন্সটিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ ড. রদজের শানাহেন বার্তা সংস্থা 9news.com.au কে বলেন, যদিও বিন সালমান সৌদি আরবের একজন সামাজিক সংস্কারক কিন্তু তিনি রাজনৈতিক সংস্কারক হতে পারেন নি।

আন্তর্জাতিকভাবে ক্রাউন প্রিন্স কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি অন্যান্য দেশের সাথে সঠিক ব্যবহার করতে বুঝে উঠেন নি এমনকি নিজের দেশের জনগণের সাথেও।’

ড. রদজের শানাহেন ইয়েমেন, কাতার এবং লেবানন সম্পর্কে বিন সালমানের নেয়া পদক্ষেপ সমূহকে আন্তর্জাতিক সূত্র-বিহীন বলে উল্লেখ করেন।

সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগ এনে ২০১৭ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতারকে কোণঠাঁসা করার জন্য দেশটির উপর স্থলপথ, সমুদ্র এবং আকাশ পথে অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদির এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, এর মাধ্যমে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ থেকে সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন ঘটবে।

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতা গ্রহণের কিছুকাল পরেই লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি একটি সৌদি টেলিভিশন থেকে ঘোষণা করেন যে, তিনি লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

লেবাননের কর্মকর্তাগণ এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট মিকাইল আউন দাবী করেন যে, সাদ হারিরিকে অপহরণ করা হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে এমন সন্দেহে তাকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।

পরবর্তীতে হারিরি লেবাননে ফিরে আসেন এবং তার পদত্যাগের ঘোষণা বাতিল করেন।

বিন সালমানের অপকর্ম এখানেই শেষ নয়। ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন বিন সালমানের কৃতকর্মে আরেকটি কালিমা লেপন করে। জাতিসংঘের মতে ইয়েমেনে সৌদি বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী হওয়ার মত পর্যাপ্ত উপাদান তদের বিরুদ্ধে রয়েছে।

এই যুদ্ধে সৌদি আরব কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে ইয়েমেনের হাজার হাজার নাগরিকদের হত্যা করেছে যাদের মধ্যে ৫০,০০০ জন শিশু রয়েছে।

ড. রদজের শানাহেন বলেন, ‘সৌদি আরবের লোকজন অতিমাত্রায় জাতীয়তাবাদী, তারা বহির্বিশ্ব থেকে কোনো ধরনের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না।’

তিনি বিন সালমানের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘তিনি আন্তর্জাতিকভাবে অনেক রাজনৈতিক শত্রু তৈরি করেছেন, কিন্তু নিজেকে ক্ষমতার আবর্তে এমনভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন যার দ্বারা তিনি নিজেই হয়ত স্থানচ্যুত হতে পারেন।’

এমনকি অক্টোবরের ২ তারিখে সাংবাদিক খাসোগি নিহত হওয়ার পরে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ এ হত্যাকাণ্ডের সাথে বিন সালমানের জড়িত থাকার ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছেন।

ড. রদজের শানাহেন বলেন, ‘সৌদি রাজ পরিবার ক্ষমতার বৃত্তে আটকা পড়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এমন হত্যাকাণ্ড বিন সালমানের জ্ঞানের বাহিরে গিয়ে ঘটে নি।’

ড. রদজের শানাহেনের মতে, বিন সালমানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিটি আসবে তার রাজ পরিবার থেকে এবং জাতীয়ভাবে জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তার কৃত ভুল সমূহের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি আরবের গায়ে ‘কালিমা’ লেপন শুরু হয়ে গেছে।

তিনি বলেন- ‘সুনাম অনেক বড় একটি বিষয়।’

সৌদি আরবের সরকারি খাতে বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত কোম্পানিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার যে ইচ্ছা তার ছিল তাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

এ ধরনের পদক্ষেপ নির্ভর করছিল পশ্চিমা বিনিয়োগের উপর কিন্তু ইয়েমেন হামলার পর আর সাম্প্রতিক খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর এধরনের আশায় গুড়ে বালি পড়েছে।

ভিশন ২০৩০ ঘোষণার পরে অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় এতে আগ্রহ দেখায় তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ধনকুবের রিচার্ড ব্রান্সন, যিনি এই সুযোগ লুফে নেনে এবং সৌদিতে দুটি ভ্রমণ-কেন্দ্র খোলার জন্য আগ্রহ দেখান এবং তারা মহাকাশ সংস্থায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার জন্য সৌদি কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ আলোচনা করেছিলেন।

কিন্তু খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পরে ব্রান্সন হচ্ছেন প্রথম বিনিয়োগকারী যিনি সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

গত বছর বিনি সালমান এক সম্মেলনে সৌদি আরবে ভবিষ্যৎ মেগা-সিটি নির্মাণের জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন। বিন সালমান সেসময় বলেছিলেন যে, ‘NEOM’ নামের এই শহরটি হবে স্বপ্ন-বাজদের অন্যতম জায়গা।

কিন্তু ‘NEOM’ প্রকল্প থেকে অন্তত ১৮ টি আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান যাদের মধ্যে সিলিকন ভ্যালি অন্যতম তাদের প্রকল্প সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে গুটিয়ে নিয়েছেন।

সূত্রঃ নাইন নিউজ

আপনার মন্তব্য লিখুন